সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সবাইকে ব্যাখ্যা করতে হয় না
প্রতিটা পারিবারিক জমায়েতে যখন আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্য বিতর্ক হয়ে যায়: নিজের মূল্যবোধ পরিষ্কার করা, সীমা টানা, আর মত বদলের জায়গাটুকু নিজের হাতে রাখা।
Direct answer
না, প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আত্মীয়দের কাছে প্রমাণ করার বিষয় নয়। দরকার তিনটে জিনিস: দুজনের মধ্যে সৎ ও নিয়মিত কথা, যাতে সিদ্ধান্তটা সত্যিই দুজনের হয়; আত্মীয়দের জন্য ছোট, ভদ্র কিন্তু দৃঢ় কয়েকটা উত্তর; আর নিজেদের কাছে এই স্বীকৃতি যে মত বদলানোর অধিকারও আপনাদেরই, চাপের নয়। শরীর বা সন্তানধারণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটা চিকিৎসকের বিষয়।
জামাইষষ্ঠীর দুপুরে পাখার হাওয়া
বারাসাতে দেবযানীর বাপের বাড়িতে জামাইষষ্ঠীর দুপুর। রজত, আটত্রিশ, ধুতি-পাঞ্জাবিতে আসনে বসে আছেন, সামনে কাঁসার থালায় ইলিশ, চিংড়ির মালাইকারি, আমের চাটনি। শাশুড়ি জলে ভেজানো তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করছেন, মাথায় ধান-দুব্বো দিলেন। ঠিক তখনই পাশ থেকে মেজোমাসি বলে উঠলেন, ষষ্ঠী ঠাকুরের আশীর্বাদ তো নিলে, এবার একটা নাতি-নাতনির মুখ দেখাও দেখি। ছত্রিশের দেবযানী হাসলেন, সেই চেনা আধখানা হাসি। ঘরভর্তি লোক হেসে উঠল। রজত মাথা নিচু করে মাছের কাঁটা বাছতে লাগলেন, যেন সেটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কাজ।
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, প্রকাশ্য আলোচনা
বিয়ের সাত বছর পরে দেবযানী আর রজত অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করেছেন তাঁরা সন্তান চান না। কারণগুলো তাঁদের নিজেদের: দুজনের কাজ, নিজেদের জীবনযাপন, কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু প্রতিটা বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, পুজোর আড্ডায় সেই সিদ্ধান্তটা যেন সবার আলোচনার বিষয়। প্রশ্নকর্তারা বেশিরভাগই খারাপ মানুষ নন; অনেকের কাছে সন্তান মানেই জীবনের পূর্ণতা, আর তাঁরা সত্যিই চিন্তিত। কিন্তু ভালোবাসা থেকে আসা প্রশ্নও বারবার এলে চাপ হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই চাপের সবচেয়ে বড় ভার প্রায়ই পড়ে মেয়েটির ওপর, যেন সিদ্ধান্তটা শুধু তারই।
আগে নিজেদের কাছে উত্তর
আত্মীয়দের সামলানোর আগে একটা শান্ত সন্ধ্যায় দুজনে বসে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে কথা বলুন। উদ্দেশ্য কাউকে রাজি করানো নয়, দুজনের মন আসলে কোথায় আছে সেটা জানা।
- আমরা কী ধরনের জীবন চাই, আর সেই ছবিতে সন্তান কেন নেই?
- সিদ্ধান্তটা কি সত্যিই দুজনের, নাকি একজন আরেকজনের জন্য মেনে নিচ্ছে?
- এটা কি একটা স্পষ্ট 'না', নাকি 'এখন নয়'?
- পরিবারের কোন প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, আর কেন?
- কখন আবার এই কথা নিয়ে দুজনে বসব, যাতে কেউ মনে চেপে না রাখে?
পছন্দ আর শরীরের প্রশ্ন আলাদা
আত্মীয়রা প্রায়ই দুটো আলাদা বিষয় গুলিয়ে ফেলেন: ইচ্ছে করে সন্তান না নেওয়া আর শরীরের কোনো কারণে সন্তান না হওয়া। কেউ কেউ ধরে নেন সমস্যা আছে, আর উপদেশ দিতে শুরু করেন কোন ডাক্তার, কোন মন্দির, কোন তাবিজ। আপনাদের সিদ্ধান্ত যদি পছন্দের হয়, সেটা স্পষ্ট করে বলার অধিকার আপনাদের, আবার না বলারও। আর যদি কোনো সময় শরীর, বয়স বা সন্তানধারণ নিয়ে সত্যিকারের প্রশ্ন জাগে, সেটা নিয়ে কথা বলার জায়গা একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসক, আত্মীয়দের আড্ডা নয়। এই লেখা কোনো চিকিৎসা-পরামর্শ দেয় না।
কে কী বলেন, আর ছোট উত্তর
প্রতিটা প্রশ্নের জন্য আলাদা যুক্তি সাজানোর দরকার নেই। যুক্তি দিলে তর্ক শুরু হয়, কারণ তখন মনে হয় আপনি রাজি হওয়ার মতো কোনো কারণ খুঁজছেন। বরং একটা ছোট, শান্ত উত্তর ঠিক করে রাখুন আর বারবার সেটাই বলুন।
| কে বলছেন | কী বলছেন | একটা সম্ভাব্য উত্তর |
|---|---|---|
| মা বা শাশুড়ি, আড়ালে | আমরা আর ক'দিন, তোদের কে দেখবে? | তোমার চিন্তাটা বুঝি মা। আমরা ভেবেচিন্তেই ঠিক করেছি, আর বুড়ো বয়সের ব্যবস্থাও আমরা নিজেরাই ভাবছি। |
| মাসি-পিসি, সবার সামনে | এবার নাতি-নাতনির মুখ দেখাও! | হেসে: আশীর্বাদটা রাখলাম মাসি। চলো, চাটনিটা কেমন হয়েছে বলো। |
| তুতো ভাইবোন বা বন্ধু | বয়স গেলে কিন্তু আফসোস করবি। | হতে পারে, আবার না-ও পারে। এটা আমাদের ঝুঁকি, আমরাই নিচ্ছি। |
| যিনি বারবার জোর করেন | এসব আধুনিক বোকামি। | এই নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি? |
উত্তর দেবেন দুজনে, একা একজন নয়
জামাইষষ্ঠীর সেই দুপুরে রজত চুপ করে থাকলেন, আর দেবযানী একা হাসি দিয়ে সামলালেন। এটা অনেক দম্পতির চেনা ছবি। সিদ্ধান্ত যদি দুজনের হয়, তাহলে প্রশ্নের ভারও দুজনের। দুজনে ঠিক করে নিন নিজের নিজের পরিবারে কে কথা বলবেন; সাধারণত নিজের মা-বাবার সঙ্গে নিজে কথা বলাই সবচেয়ে কম তিক্ত হয়। আর কেউ যদি একজনকে আড়ালে ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, সেটা একে অপরকে জানান। একজন চুপ করে থাকলে অন্যজনকে একা দোষী দেখায়, আর সেই দূরত্ব ধীরে ধীরে দাম্পত্যেও ঢোকে।
আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত আমরা ভালোবাসা নিয়ে শুনব, কিন্তু নেব নিজেরাই।
অনিশ্চয়তার জন্যও একটু জায়গা
সিদ্ধান্ত পাকা মানে এই নয় যে জীবনে কখনও কোনো দ্বিধা আসবে না। কোনো বন্ধুর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হঠাৎ মন কেমন করতে পারে, আবার পরের দিনই মনে হতে পারে যা ঠিক করেছি সেটাই ঠিক। দুটোই স্বাভাবিক। মত বদলানোর অধিকার আপনাদের আছে, কিন্তু সেই বদল আসা উচিত নিজেদের ভেতর থেকে, কারও চাপে বা অপরাধবোধে নয়। বছরে একবার দুজনে বসে নিজেদের জিজ্ঞেস করুন, এখনও কি এটাই চাই। উত্তর একই থাকলে সেটা আরও জোরালো হয়; বদলালে সেটাও সৎ। আর চাপ যদি হুমকি, অপমান বা হিংসার দিকে যায়, সেটা আর পারিবারিক মতভেদ নয়; বিপদ মনে হলে 112 নম্বরে ফোন করুন।
জন্মছক দেখিয়ে চাপ দেওয়া চলে না
অনেক বাঙালি বাড়িতে এই প্রসঙ্গে কোষ্ঠীও চলে আসে: কেউ বলেন, ওর ছকে তো সন্তানযোগ আছে, পুরুতমশাই বলেছেন। বৈদিক জ্যোতিষে পঞ্চম ভাবকে ঐতিহ্যগতভাবে সন্তান, সৃষ্টিশীলতা আর বুদ্ধির সঙ্গে জুড়ে পড়া হয়। কিন্তু ছকে কোনো যোগ থাকা মানে সেটা পূরণ করার দায় নয়; পঞ্চম ভাবের শক্তি একজনের লেখায়, পড়ানোয়, অন্যের যত্ন নেওয়াতেও প্রকাশ পেতে পারে। আর কারও জন্মছক তাঁর সম্মতি ছাড়া দেখিয়ে তাঁর ওপর চাপ দেওয়া জ্যোতিষের অপব্যবহার। দাম্পত্যের নানা দিক নিয়ে ভাবতে চাইলে প্রেম ও সম্পর্কের জ্যোতিষের পাতাটা দেখতে পারেন, আর নিজের ছক নিজে দেখতে চাইলে বিনামূল্যে জন্মছক বানানোর টুল আছে।
সেদিন সন্ধেবেলা
খাওয়াদাওয়ার পরে, অতিথিরা চলে গেলে, দেবযানী রান্নাঘরে মায়ের পাশে বাসন গোছাতে গোছাতে বললেন, মা, মাসির কথাটা নিয়ে তোমার সঙ্গে একটু বসব একদিন। মা কিছু বললেন না, শুধু মাথা নাড়লেন। ফেরার ট্রেনে রজত বললেন, আজ আমার কিছু বলা উচিত ছিল। দেবযানী বললেন, পরের বার বলবে। সমস্যার সমাধান হল না, কিন্তু দুজনে আবার একই দিকে দাঁড়ালেন। নিজেদের ছকে দাম্পত্যের ধরন নিয়ে প্রশ্ন থাকলে Astro Ratan-কে হোয়াটসঅ্যাপে বাংলায় লিখতে পারেন; এটি একটি এআই বৈদিক জ্যোতিষী, প্রত্যেকের নিজের ছক থেকে, তাঁর সম্মতি নিয়ে পড়ে। কিন্তু আপনাদের জীবন কেমন হবে, সেটা কোনো ছক ঠিক করে না।
Key takeaways
- সিদ্ধান্তটা আগে দুজনের মধ্যে পরিষ্কার হওয়া দরকার; আত্মীয়দের উত্তর দেওয়ার আগে নিজেদের উত্তর।
- ইচ্ছে করে সন্তান না নেওয়া আর শরীরের কারণে না হওয়া আলাদা বিষয়; দ্বিতীয়টার জন্য চিকিৎসকের কাছে যান, আত্মীয়দের কাছে নয়।
- প্রতিটা প্রশ্নের জন্য লম্বা যুক্তি লাগে না; ছোট, শান্ত, একই উত্তর বারবার দেওয়াই সবচেয়ে কাজের।
- মত বদলানোর দরজা খোলা রাখা আর চাপের কাছে হার মানা এক জিনিস নয়।
- জন্মছকে সন্তান-সংক্রান্ত ভাব থাকা কোনো নির্দেশ নয়; কারও ছক দেখিয়ে চাপ দেওয়া তার সম্মতির অসম্মান।
যে দম্পতি প্রতিটা নেমন্তন্নে একই প্রশ্ন শুনে ক্লান্ত, তাঁদের জন্য: কাউকে অসম্মান না করে নিজেদের সিদ্ধান্ত আগলে রাখার সহজ কয়েকটা উপায়।
দাম্পত্যে নিজেদের পথ বেছে নেওয়ার সময় দুজনের নিজের নিজের ছক কী বলে, সম্মতি নিয়ে জানতে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন।
