ক্রেডিট কার্ড আর 'এখন কিনুন, পরে দিন'-এর ধার লুকিয়ে রাখছেন? লজ্জা নয়, দরকার একটা পরিকল্পনা
না-খোলা স্টেটমেন্ট, উল্টে রাখা ফোন, ঝাপসা সংখ্যা। লুকোনোর বদলে সব ধারের একটা পুরো মানচিত্র, জরুরি খরচ আগে রাখার পরিকল্পনা, আর দরকারে যোগ্য মানুষের সাহায্য।
Direct answer
প্রথম কাজ লজ্জা নয়, হিসাব। এক ঘণ্টা বসে প্রতিটা কার্ড আর 'এখন কিনুন, পরে দিন' অ্যাপের মোট বকেয়া, সুদ বা জরিমানা, ন্যূনতম কিস্তি আর শেষ তারিখ একটা তালিকায় লিখুন। তারপর আগে ভাড়া, খাবার, ওষুধের মতো জরুরি খরচ রাখুন, সব ধারে অন্তত ন্যূনতম টাকা দিন, আর বাড়তি টাকা একটা ধারে দিন। নতুন ধার বন্ধ করুন, আর দরকারে ব্যাংকের সঙ্গে বা যোগ্য পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলুন।
চায়ের দোকানে উল্টে রাখা ফোন
রবিবার সকালে দমদম পার্কের মোড়ের চায়ের দোকানে বন্ধুদের আড্ডা। তথাগত, তিরিশ, ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, ভাঁড়ে চুমুক দিচ্ছিল। ফোনের পর্দায় মেসেজ ভেসে উঠল: আপনার কার্ডের ন্যূনতম বকেয়া প্রদানের আজ শেষ দিন। তার পরপরই একটা অ্যাপের নোটিফিকেশন, কিস্তি বাকি। তথাগত ফোনটা উল্টে বেঞ্চে রাখল। বন্ধুরা পুজোর পরে দার্জিলিং যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ও বলল, এবার হবে না রে, কাজের খুব চাপ। আসল কথাটা হল, মেলের মধ্যে একটা ফোল্ডার আছে, নাম 'পরে', তাতে চার মাসের না-খোলা স্টেটমেন্ট। মোট ধার কত, সে নিজেও ঠিক জানে না।
লজ্জা সংখ্যাকে ঝাপসা রাখে
ধারের সঙ্গে যে লজ্জা আসে, সেটা খুব চুপচাপ কাজ করে। স্টেটমেন্ট না খুললে মনে হয় সমস্যাটা এখনও পুরো সত্যি হয়নি। বকেয়ার মেসেজ উল্টে রাখলে কিছুক্ষণের জন্য বুকের চাপটা কমে। কিন্তু না-দেখা সংখ্যা থেমে থাকে না; দেরির জরিমানা যোগ হয়, সুদের ওপর সুদ জমে, আর ধারের নথিতে দেরির দাগ পড়ে, যা পরে কোনো ঋণ নিতে গেলে সমস্যা করে। লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু আপনি করেননি, এমন নয়; হয়তো কিছু কেনাকাটা না করলেই চলত। কিন্তু লজ্জা দিয়ে ধার শোধ হয় না। শোধ হয় হিসাব দিয়ে। আর হিসাবটা শুরু করা যায় আজই, এক ঘণ্টায়।
এক ঘণ্টায় ধারের মানচিত্র
একটা শান্ত সময় বেছে নিন, পাশে জল রাখুন, আর প্রতিটা কার্ড আর অ্যাপ খুলে এই পাঁচটা তথ্য লিখুন। নিচের তালিকাটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ, আপনার সংখ্যা আলাদা হবে। সুদের হার বা জরিমানা নিজের স্টেটমেন্ট বা অ্যাপের শর্তাবলি থেকে দেখে নিন, আন্দাজে লিখবেন না।
| কোথা থেকে ধার | মোট বকেয়া | সুদ বা জরিমানা | ন্যূনতম কিস্তি | শেষ তারিখ |
|---|---|---|---|---|
| প্রথম ক্রেডিট কার্ড | ₹৬০,০০০ | ধরা যাক মাসে ৩.৫% | ₹৩,০০০ | প্রতি মাসের ৫ তারিখ |
| দ্বিতীয় ক্রেডিট কার্ড | ₹১৮,০০০ | স্টেটমেন্ট দেখে লিখুন | ₹৯০০ | প্রতি মাসের ১২ তারিখ |
| কেনাকাটার অ্যাপের কিস্তি | ₹৯,০০০ | সময়ে দিলে সুদ নেই, দেরিতে জরিমানা | ₹৩,০০০ | প্রতি মাসের ২০ তারিখ |
| খাবার অর্ডারের অ্যাপের 'পরে দিন' | ₹৪,৫০০ | দেরিতে জরিমানা | পুরোটা একবারে | মাসের শেষ দিন |
ন্যূনতম বকেয়ার ফাঁদটা একবার হিসাব করে দেখুন
ওপরের উদাহরণের প্রথম কার্ডটা ধরুন। ষাট হাজার টাকার ওপর মাসে সাড়ে তিন শতাংশ সুদ মানে এক মাসেই প্রায় দু'হাজার একশো টাকা সুদ। আপনি যদি শুধু ন্যূনতম তিন হাজার টাকা দেন, তার মধ্যে দু'হাজার একশো যায় সুদে, আসল ধার কমে মাত্র ন'শো টাকার মতো। এর ওপর কর বা অন্য চার্জ থাকলে আসল কমে আরও কম। আর সেই মাসে কার্ডে নতুন কিছু কিনলে ধার আসলে বাড়েই। এই হিসাবটা নিজের সংখ্যা দিয়ে একবার করুন। ভয় পাওয়ার জন্য নয়, বোঝার জন্য যে ন্যূনতম বকেয়া দিয়ে দেরির জরিমানা এড়ানো যায়, কিন্তু ধার থেকে বেরোনো যায় না।
আগে জীবন চালানো, তারপর ধার
মাসের টাকা ভাগ করার একটা সহজ ক্রম আছে। প্রথমে জীবন চালানোর জরুরি খরচ: বাড়িভাড়া, খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ, কাজে যাওয়ার যাতায়াত। এগুলো বাদ দিয়ে ধার শোধ করলে পরের মাসেই আবার কার্ডে হাত পড়বে। তারপর প্রতিটা ধারে অন্তত ন্যূনতম কিস্তি, যাতে জরিমানা আর নথিতে দেরির দাগ না পড়ে। তারপর যা বাঁচে, পুরোটা একটা ধারে। কোন ধারে, সেটা ঠিক করার দুটো পরিচিত পদ্ধতি আছে।
- অ্যাভালাঞ্চ পদ্ধতি: আগে সবচেয়ে বেশি সুদের ধার শোধ করুন। মোট সুদ সবচেয়ে কম লাগে।
- স্নোবল পদ্ধতি: আগে সবচেয়ে ছোট অঙ্কের ধার শোধ করুন। তাড়াতাড়ি একটা ধার শেষ হওয়ার স্বস্তি মনকে এগিয়ে রাখে।
- যেটাই বাছুন, একটা শেষ হলে তার কিস্তির টাকাটা পরের ধারে যোগ করুন, খরচে নয়।
ফুটোটা আগে বন্ধ করুন
বালতি থেকে জল ছেঁচে লাভ নেই যদি তলায় ফুটো থাকে। কেনাকাটা আর খাবারের অ্যাপ থেকে সেভ করা কার্ড মুছে দিন, 'পরে দিন' সুবিধাটা বন্ধ করুন, আর কিছুদিন কার্ড বাড়িতে রেখে বেরোন। সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হল পুরনো ধার শোধ করতে কোনো অ্যাপ থেকে দ্রুত ঋণ নেওয়া। অনেক ঋণের অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত নয়, তাদের শর্ত আর আদায়ের পদ্ধতি দুটোই ভয়ানক হতে পারে। যে কোনো ঋণ নেওয়ার আগে দেখে নিন সেটা রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থার কি না।
ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলা, আর যোগ্য সাহায্য
অনেকে জানেন না যে ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলা যায়। কার্ডের বকেয়া কিস্তিতে বদলানো যায় কি না, সুদ কিছুটা কমানো যায় কি না, কয়েক মাসের জন্য কোনো ব্যবস্থা হয় কি না, ব্যাংকের গ্রাহক পরিষেবায় জিজ্ঞেস করুন। যে প্রস্তাবই আসুক, লিখিত নিন, আর শর্ত বুঝে তবে রাজি হোন। 'সেটলমেন্ট' বা আংশিক টাকায় মিটিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব শুনতে ভালো লাগলেও ধারের নথিতে তার ছাপ থেকে যায়, তাই আগে পরিণাম বুঝে নিন। পরিস্থিতি জটিল হলে একজন যোগ্য আর্থিক পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলুন; এই লেখা সাধারণ ধারণা দেয়, আপনার ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শ নয়। ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থার আচরণ নিয়ে অভিযোগের সুরাহা না হলে রিজার্ভ ব্যাংকের লোকপাল ব্যবস্থায় অভিযোগ জানানো যায়।
ধার একটা সংখ্যা, আপনার চরিত্রের সার্টিফিকেট নয়। সংখ্যা বদলানো যায়, শুরু হয় সেটা চোখ খুলে দেখা থেকে।
একজন মানুষকে বলুন
লুকিয়ে রাখা ধার সবচেয়ে ভারী হয় কারণ তার সঙ্গে থাকে মিথ্যে বলার ক্লান্তি: বন্ধুদের কাছে কাজের চাপের অজুহাত, বাড়িতে সব ঠিক আছে ভাব। অন্তত একজন বিশ্বস্ত মানুষকে পুরো সংখ্যাটা বলুন, দিদি, বন্ধু বা জীবনসঙ্গী। তাঁর কাছে টাকা চাওয়ার জন্য নয়, একা না থাকার জন্য। অনেক সময় বলার পরে দেখা যায়, যাঁকে বললেন তিনিও কোনো না কোনো সময় এমন অবস্থায় ছিলেন। আর যদি লজ্জা আর দুশ্চিন্তা এমন হয় যে ঘুম হয় না, খেতে ইচ্ছে করে না, বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো অন্ধকার চিন্তা আসে, তাহলে আজই Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন; বিনা খরচে, চব্বিশ ঘণ্টা, বাংলায় কথা বলা যায়। প্রাণের ঝুঁকি মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে 112। কোনো আদায়কারী ভয় দেখালে বা হেনস্থা করলে সেটা মেনে নেবেন না; ব্যাংকের অভিযোগ বিভাগে আর দরকারে পুলিশে জানান।
গ্রহ দিয়ে ধার শোধের সময় বাছা যায় না
টাকার টানাটানির সময় কেউ কেউ ভাবেন, হয়তো শনির দশা বা কোনো খারাপ গোচর চলছে, একটা প্রতিকার করলেই ঠিক হয়ে যাবে। কোনো গ্রহ বা প্রতিকার ধারের অঙ্ক কমায় না, আর বিনিয়োগ বা ধার শোধের সময় গ্রহ দেখে ঠিক করা উচিত নয়। যে অ্যাপ বা মানুষ এই অবস্থায় ভয় দেখিয়ে দামি প্রতিকার বিক্রি করতে চায়, তার থেকে দূরে থাকুন; জ্যোতিষ অ্যাপের ভয়ের বার্তা নিয়ে আমাদের লেখায় এর চেনা লক্ষণগুলো বলা আছে। বিংশোত্তরী দশার কোন পর্ব চলছে জানলে কেউ কেউ নিজের এই সময়টাকে একটু ধৈর্য নিয়ে দেখতে পারেন, এইটুকুই। Astro Ratan রত্ন বা পুজো বিক্রি করে না, আর মিনিট ধরে টাকাও কাটে না; সদস্যপদের শর্ত মূল্যের পাতায় পরিষ্কার লেখা আছে।
তথাগতর রবিবার রাত
সেদিন রাতে তথাগত 'পরে' ফোল্ডারটা খুলল। চারটে স্টেটমেন্ট, দুটো অ্যাপ, একটা খাতা। মোট অঙ্কটা লিখে ফেলার পরে প্রথমে গলা শুকিয়ে গেল, তারপর অবাক হয়ে টের পেল বুকের চাপটা একটু কমেছে; অঙ্কটা ভয়ের, কিন্তু অন্তত এখন সেটা জানা। পরের দিন অফিসের কাজের ফাঁকে ব্যাংকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল বকেয়া কিস্তিতে বদলানো যায় কি না, আর খাবারের অ্যাপ থেকে কার্ড মুছে দিল। রাতে দিদিকে ফোন করে সব বলল। দিদি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আগে বলিসনি কেন রে বোকা। দার্জিলিং এবারও হল না। কিন্তু তথাগত জানে, সামনের বছর কোন মাসে কোন ধার শেষ হবে।
Key takeaways
- না-খোলা স্টেটমেন্ট ধার কমায় না, শুধু জরিমানা আর সুদ বাড়ায়; সব সংখ্যা এক তালিকায় আনাই প্রথম ধাপ।
- শুধু ন্যূনতম বকেয়া দিলে টাকার বড় অংশ সুদে যায়, আসল ধার খুব ধীরে কমে।
- অ্যাভালাঞ্চ পদ্ধতিতে আগে সবচেয়ে বেশি সুদের ধার, স্নোবল পদ্ধতিতে আগে সবচেয়ে ছোট ধার শোধ হয়।
- পুরনো ধার শোধ করতে নতুন অ্যাপ থেকে ধার নেওয়া চক্রটাকে আরও শক্ত করে।
- অন্তত একজন বিশ্বস্ত মানুষকে জানান; লজ্জা একা বয়ে বেড়ালে সিদ্ধান্ত আরও ঝাপসা হয়।
যে বন্ধু বকেয়ার মেসেজ এলেই ফোন উল্টে রাখে, তাকে পাঠান: কাউকে না বকে, এক ঘণ্টায় ধারের পুরো হিসাব করে শুরু করার পথ।
টাকার এই চাপের সময়টা নিজের জন্মছকে কোন দশার মধ্যে পড়ছে, ভয় না পেয়ে শান্তভাবে বুঝতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন।
