বাবার ব্যবসায় বসব, না নিজের ক্যারিয়ার গড়ব?
পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেওয়াকে আনুগত্যের পরীক্ষা না বানিয়ে, একটা নির্দিষ্ট দায়িত্ব আর সময়সীমার পরীক্ষা হিসেবে দেখলে সিদ্ধান্তটা অনেক পরিষ্কার হয়।
Direct answer
হ্যাঁ বা না বলার আগে ঠিক করুন, ব্যবসায় যোগ দিলে আপনার ভূমিকা কী হবে: কোন কাজ আপনার, কোন সিদ্ধান্ত আপনি একা নিতে পারবেন, মাইনে কত। তারপর ছ'মাসের একটা লিখিত পরীক্ষা প্রস্তাব করুন, শেষে একটা পর্যালোচনার দিন সহ। নিজের পথ বাছলেও পরিবারকে ছেড়ে যাওয়া হয় না; কোন সময়ে, কতটা সাহায্য করবেন, সেটা স্পষ্ট করে বলুন।
হালখাতার সকালে লাল খাতা
পয়লা বৈশাখের সকাল। বর্ধমানের কার্জন গেটের কাছে তিস্তাদের তিন পুরুষের মিষ্টির দোকানের কাচের শোকেসে সাজানো সীতাভোগ আর মিহিদানা, দরজায় আমপাতা আর গাঁদার মালা। পুরুতমশাই সবে পুজো সেরে গেছেন। তিস্তার বাবা, তেষট্টি, নতুন লাল খেরো খাতার প্রথম পাতায় সিঁদুরের স্বস্তিক আঁকলেন, তারপর খাতাটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, এবার থেকে এটা তুই লিখবি। দাদা তো বেঙ্গালুরুতে, আর ফিরবে না। দোকানভর্তি চেনা খদ্দের হাততালি দিলেন। চব্বিশ বছরের তিস্তা খাতাটা হাতে নিয়ে হাসল। তার ব্যাগে তখন কলকাতার একটা খাদ্য সংস্থার কোয়ালিটি ল্যাবের নিয়োগপত্র, জয়েনিংয়ের তারিখ আর তিন সপ্তাহ পরে। কথাটা এখনও বাড়িতে কাউকে বলা হয়নি।
আনুগত্য আর নিজের পথ, সত্যিই কি উল্টো?
ব্যবসায়ী পরিবারে এই প্রশ্ন প্রায়ই একটা ভুল চেহারায় আসে: তুমি কি পরিবারের পাশে আছ, না নেই? এভাবে দেখলে যে কোনো উত্তরই কষ্টের। হ্যাঁ বললে মনে হয় নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিলাম, না বললে মনে হয় বাবার তিরিশ বছরের পরিশ্রমকে পিঠ দেখালাম। অথচ তিস্তা দোকানটাকে ভালোবাসে। ছোটবেলায় ছুটির দিনে সে ক্যাশবাক্সের পাশে বসে থাকত, খাদ্য প্রযুক্তি পড়তে গিয়েছিল খানিকটা মিষ্টির জন্যই। তার দ্বিধাটা দোকান নিয়ে নয়। দ্বিধাটা হল, দোকানে ঢুকলে সে কি নিজের মাথায় কিছু করতে পারবে, না চিরকাল বাবার ছায়ায় খাতা লিখবে। প্রশ্নটা তাই আনুগত্যের নয়, ভূমিকার।
হ্যাঁ বলার আগে যা পরিষ্কার হওয়া দরকার
পারিবারিক ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি অশান্তি হয় না-বলা প্রত্যাশা থেকে। বাবা ভাবছেন মেয়ে ধীরে ধীরে সব শিখে নেবে, মেয়ে ভাবছে প্রথম দিন থেকেই কিছু বদলাতে পারবে। তাই যোগ দেওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন।
| প্রশ্ন | কেন জরুরি |
|---|---|
| কোন কাজটা পুরোপুরি আমার দায়িত্ব? | সব কাজে একটু একটু হাত দিলে কোনোটাতেই নিজের ছাপ পড়ে না |
| কোন সিদ্ধান্ত আমি কাউকে না জিজ্ঞেস করে নিতে পারব? | প্রতিটা ছোট সিদ্ধান্তে অনুমতি লাগলে স্বাধীনতার বোধটাই হারিয়ে যায় |
| মাইনে কত, কবে থেকে? | 'সবই তো তোর' কথাটা মাসের খরচ চালায় না, আর আত্মসম্মানও রাখে না |
| মতের অমিল হলে শেষ কথা কার, আর কোথায় বসে কথা হবে? | খদ্দেরের সামনে বা খাওয়ার টেবিলে ব্যবসার তর্ক সম্পর্ক নষ্ট করে |
| কয়েক বছর পরে সরে যেতে চাইলে কী হবে? | বেরোনোর দরজা জানা থাকলে ঢোকার সিদ্ধান্ত সহজ হয় |
ছ'মাসের একটা সম্মানজনক পরীক্ষা
চিরকালের সিদ্ধান্ত এক সকালে নেওয়ার দরকার নেই। তার বদলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষা প্রস্তাব করুন, যাতে দুই পক্ষই দেখতে পায় ব্যাপারটা আসলে কেমন চলে। তিস্তার ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে এরকম: ছ'মাস সে দোকানে থাকবে একটা নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে, মিষ্টির মান পরীক্ষা, প্যাকেটের মিষ্টি যাতে বেশিদিন ভালো থাকে তার ব্যবস্থা, আর অনলাইন অর্ডার। এই তিনটে বিষয়ে সিদ্ধান্ত তার, মাইনে নির্দিষ্ট, আর আশ্বিনের পুজোর আগে একদিন বাবা-মেয়ে বসে লেখা খাতা মিলিয়ে দেখবে কী হল। উল্টোটাও সম্ভব: চাকরিতে যোগ দিয়ে ছ'মাস প্রতি রবিবার দোকানের একটা প্রকল্প হাতে নেওয়া। যেটাই বাছুন, শর্তগুলো কাগজে লিখে দুজনে সই করুন। কাগজে লেখা মানে অবিশ্বাস নয়; মানে দুজনেই পরে একই কথা মনে রাখবেন।
কথাটা কীভাবে তুলবেন
উৎসবের দিনে, খদ্দেরের সামনে এই কথা তুলবেন না। একটা শান্ত সন্ধে বেছে নিন, আর শুরু করুন কৃতজ্ঞতা দিয়ে, দাবি দিয়ে নয়। তিস্তা যেভাবে বলেছিল: বাবা, দোকানটা আমার কাছে কী, তুমি জানো। আমি এখানে আসতে চাই, কিন্তু কর্মচারী হয়ে নয়, একটা কাজের পুরো দায়িত্ব নিয়ে। আর একটা চাকরির চিঠিও আমার কাছে আছে; সেটা লুকোতে চাই না। চলো ছ'মাসের একটা ব্যবস্থা করি, তারপর দুজনে মিলে ঠিক করব। বাবা প্রথমে রেগে যেতে পারেন, বা চুপ করে যেতে পারেন। সেদিনই উত্তর চাইবেন না। প্রস্তাবটা লিখে দিয়ে আসুন, ভাবার সময় দিন।
পরিবারের পাশে থাকা মানে সবসময় একই চেয়ারে বসা নয়। কখনও কখনও নিজের চেয়ারটা খুঁজে পাওয়াই পরিবারের সবচেয়ে বড় লাভ।
টাকা আর মালিকানার কথা খোলাখুলি
অনেক পারিবারিক ব্যবসায় ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর কাজ করেন কোনো নির্দিষ্ট মাইনে ছাড়া, কারণ ধরে নেওয়া হয় সবই তো একদিন তাদের হবে। এতে দুটো সমস্যা হয়। নিজের রোজগারের কোনো মাপ থাকে না, আর বিয়ে, আলাদা সংসার বা নিজের কোনো প্রয়োজনের সময় প্রতিটা টাকার জন্য হাত পাততে হয়। একটা নির্দিষ্ট মাইনে চান, ব্যক্তিগত আর ব্যবসার খাতা আলাদা রাখুন। মালিকানা, অংশীদারি বা ভবিষ্যতে ভাইবোনদের ভাগ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে একজন হিসাবরক্ষক বা আইনজীবীর সঙ্গে বসুন। এই কথা তোলা লোভ নয়, দূরদর্শিতা।
দাদা, মা, আর বাকিরা
তিস্তার দাদা বেঙ্গালুরুতে থাকলেও এই সিদ্ধান্তের বাইরে নন। দোকানের ভবিষ্যৎ, বাবার বয়স, মায়ের মতামত, সবকিছুতে তাঁরও একটা ভাগ আছে। অনেক পরিবারে যে সন্তান কাছে থাকে, তার ওপর সব দায় চাপে, আর যে দূরে থাকে সে কিছুটা অপরাধবোধে চুপ করে থাকে। একটা ভিডিও কলে সবাইকে নিয়ে বসুন। নিজের প্রস্তাবটা বলুন, আর দাদাকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করুন, তুমি কীভাবে পাশে থাকতে পারবে। দায়িত্ব ভাগ হলে একা একজনের কাঁধে পুরো ব্যবসা ওঠে না।
নিজের পথ বাছলে সম্পর্কটা কী হবে
ছ'মাসের পরে যদি দেখেন আপনার জায়গা অন্য কোথাও, তাহলে সেটা বলার সাহসও রাখুন। না বলা মানে পরিবারকে ছেড়ে যাওয়া নয়। স্পষ্ট করে বলুন কোথায়, কতটা থাকবেন: পুজো আর বিয়ের মরসুমে ছুটি নিয়ে আসা, মাসে একবার হিসাব দেখে দেওয়া, অনলাইন অর্ডারের ব্যবস্থাটা চালু রেখে যাওয়া। সীমিত কিন্তু নির্ভরযোগ্য সাহায্য অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি কাজের। আর বাবা-মায়ের কষ্টটা মেনে নিন। তাঁরা হয়তো একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন; সেই স্বপ্ন ভাঙার দুঃখ তাঁদের পাওয়ার অধিকার আছে।
ছক কি বলে দেবে কোন পথ ঠিক?
ব্যবসায়ী পরিবারে অনেক সময় বড়রা ছেলেমেয়ের ছক দেখিয়ে জানতে চান, ব্যবসা না চাকরি। কোনো জন্মছক আনুগত্য মাপে না, আর আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কেউ আপনার ছক দেখে নিতে পারে না। নিজে যদি ভাবতে চান, দশম ভাব কাজের জগৎ নিয়ে একটা দিক দেখায়, আর বিংশোত্তরী দশায় এখন কোন মহাদশা আর অন্তর্দশা চলছে, তা দেখে কেউ কেউ বুঝতে চান সময়টা নতুন দায়িত্ব নেওয়ার, না প্রস্তুতির। এটুকুই। বিনামূল্যের কুণ্ডলী টুলে নিজের ছকটা বানিয়ে রাখতে পারেন, আর ক্যারিয়ার ও জ্যোতিষের পাতা থেকে নিজের প্রশ্ন সাজাতে পারেন। Astro Ratan-এর এআই জ্যোতিষী আপনার নিজের ছক ধরে বাংলায় কথা বলবে, কিন্তু খাতাটা কে লিখবে, সেটা ঠিক করবেন আপনিই।
তিস্তার সই করা কাগজ
তিস্তা সেই সপ্তাহেই বাবাকে চাকরির চিঠির কথা বলেছিল। বাবা দু'দিন প্রায় কথা বলেননি। তৃতীয় দিন রাতে দোকান বন্ধ করে ফিরে বললেন, কাগজে লিখতে হবে? তারপর নিজেই একটা সাদা পাতা এনে দিলেন। তিস্তা লিখল তিনটে দায়িত্ব, মাইনে, আর আশ্বিনের পর্যালোচনার তারিখ। সংস্থাকে জয়েনিং পিছোনোর অনুরোধ করেছিল, তারা রাজি হয়নি; চিঠিটা সে জেনেবুঝেই ছেড়ে দিয়েছে, আর ডায়েরিতে লিখে রেখেছে ছ'মাস পরে কোন তিনটে জিনিস দেখে ঠিক করবে থাকবে কি না। লাল খাতায় এখন দুটো হাতের লেখা। একটা বাবার, গোটা গোটা অক্ষরে। আরেকটা তিস্তার, পাশে একটা ছোট স্প্রেডশিট ছাপিয়ে আঠা দিয়ে লাগানো।
Key takeaways
- ব্যবসায় যোগ দেওয়াকে আনুগত্যের প্রশ্ন না বানিয়ে ভূমিকার প্রশ্ন করুন: কোন কাজ, কোন সিদ্ধান্ত, কত মাইনে।
- ছ'মাসের লিখিত পরীক্ষা, একটা নির্দিষ্ট প্রকল্প আর একটা পর্যালোচনার দিন সিদ্ধান্তকে আবেগ থেকে অভিজ্ঞতায় আনে।
- 'সবই তো একদিন তোর হবে' মাইনের বিকল্প নয়; ব্যক্তিগত আর ব্যবসার টাকা আলাদা রাখুন।
- নিজের পথ বাছলেও উৎসবের মরসুমে সাহায্য বা পরামর্শের মতো সীমিত, স্পষ্ট ভূমিকা রাখা যায়।
- জন্মছক আনুগত্য মাপে না; দশার সময়কাল বড়জোর নিজের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবার একটা সূত্র।
যে বন্ধুকে বাড়ি থেকে বলা হচ্ছে দোকানে বসতে, অথচ সে অন্য কিছু করতে চায় আর মুখ ফুটে বলতে পারছে না, তাকে পাঠান: দুই দিকের সম্মান রেখে কথা বলার একটা বাস্তব উপায়।
পারিবারিক ব্যবসা আর নিজের চাকরির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের ছকের দশাকাল নিয়ে শান্তভাবে ভাবতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় আপনার প্রশ্নটা লিখুন।
