বন্ধুত্ব ভাঙাও এক রকম মন ভাঙা—সেই কষ্টকে ছোট করে দেখবেন না
বন্ধুত্ব শেষ হওয়ার কোনো নিয়ম বা আচার নেই, তাই শোকটাও প্রায়ই নামহীন থেকে যায়। কষ্টটাকে স্বীকার করা, সম্পর্কটা সৎভাবে ফিরে দেখা, আর তাড়াহুড়ো না করে আবার মানুষের কাছে ফেরার কথা।
Direct answer
প্রিয় বন্ধুকে হারানোর কষ্ট প্রেম ভাঙার চেয়ে কম কিছু নয়, আর সেটা স্বীকার করাই প্রথম কাজ। তারপর সৎভাবে ফিরে দেখুন সম্পর্কটা কোথায়, কেন সরে গেল, আর তাতে আপনার ভাগ কতটা। চাইলে একটা ছোট, দোষারোপহীন বার্তা পাঠান, উত্তর না এলেও নিজের মনে একটা বিদায় দিন। নতুন বন্ধু খোঁজায় তাড়াহুড়ো করবেন না, চেনা সম্পর্কগুলোকে আগে যত্ন দিন।
রাত বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট
বাঁশদ্রোণীর ফ্ল্যাটে শর্মিষ্ঠার আটত্রিশতম জন্মদিনের আগের রাত। স্বামী আর মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শর্মিষ্ঠা বারান্দায় বসে আছে, ফোনটা হাঁটুর ওপর উপুড় করে রাখা। চব্বিশ বছর ধরে, জলপাইগুড়ির স্কুলের দিন থেকে, রাত ঠিক বারোটায় প্রথম ফোনটা আসত তানিয়ার কাছ থেকে, বেসুরো গলায় 'হ্যাপি বার্থডে' গেয়ে, তারপর আধঘণ্টা গল্প। বারোটা বাজল। বারোটা দশ। বারোটা চল্লিশ। অন্যদের শুভেচ্ছা আসছে, মাসিমণি, অফিসের দল, কলেজের গ্রুপ। তানিয়ার নামটা আসে না। শর্মিষ্ঠা একবার তানিয়ার প্রোফাইলটা খুলল। ঘণ্টাখানেক আগে সে অন্য কারও একটা ছবিতে ভালোবাসার চিহ্ন দিয়েছে। শর্মিষ্ঠা ফোনটা বন্ধ করে দিল। তারপর অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইল, কারণ কাঁদার কারণটা কাউকে বোঝানো যাবে না।
যে বিচ্ছেদের কোনো নাম নেই
প্রেম ভাঙলে লোকে বোঝে, বন্ধুরা খোঁজ নেয়, কেউ বলে সময় লাগবে। বিবাহবিচ্ছেদের আইনি নিয়ম আছে, মৃত্যুর পরে শ্রাদ্ধ আছে। কিন্তু বন্ধুত্ব শেষ হলে কোনো ঘোষণা হয় না, কোনো আচার নেই, কেউ সান্ত্বনা দিতে আসে না। উল্টে শোনা যায়, বন্ধু তো আসে যায়, এত মন খারাপের কী আছে? তাই এই কষ্টটা অনেকে লুকিয়ে বয়ে বেড়ান, আর নিজেকেই বোঝান যে এটা বাড়াবাড়ি। বাড়াবাড়ি নয়। যে মানুষটা প্রায় রোজ আপনার জীবনে ছিল, সে হঠাৎ নেই; শরীর আর মন সেটাকে একটা হারানো হিসেবেই চেনে। শোকটার নাম দিন, তাহলে তাকে সামলানো সহজ হবে।
আসলে কী কী হারিয়েছে
একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে শুধু একজন মানুষ হারায় না। হারায় আপনার জীবনের একজন সাক্ষী, যে জানত স্কুলে আপনার ডাকনাম কী ছিল, কোন শিক্ষকের ভয়ে আপনি টিফিন খেতেন না, প্রথম প্রেমের চিঠিটা কে লিখে দিয়েছিল। হারায় একটা ভবিষ্যৎ, যেখানে বুড়ো বয়সে দুজনে একসঙ্গে দার্জিলিং যাওয়ার কথা ছিল। আর হারায় নিজের একটা অংশ, যে শুধু ওই মানুষটার সামনেই বেরোত, বোকা, হাসিখুশি, নিশ্চিন্ত। এই পুরো তালিকাটা চিনে নিলে বোঝা যায় কষ্টটা কেন এত গভীর। আর এও বোঝা যায়, এর কয়েকটা জিনিস অন্য সম্পর্কেও আবার খুঁজে পাওয়া সম্ভব, সবটা না হলেও।
সম্পর্কটা সৎভাবে ফিরে দেখা
শোক একটু থিতোলে একদিন শান্ত মনে বসে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর লিখুন। দোষী খোঁজার জন্য নয়, বোঝার জন্য।
- দূরত্বটা কবে থেকে শুরু হয়েছিল? কোনো একটা ঘটনা, না বছরের পর বছর ধরে আস্তে আস্তে সরে যাওয়া?
- কোন কথাটা দুজনের কেউই কোনোদিন বলেনি, অথচ দুজনেই জানত?
- এতে আমার ভাগ কতটা? কোথায় আমি ব্যস্ততায়, অভিমানে বা ভয়ে চুপ করে ছিলাম?
- শেষ দু-তিন বছরে বন্ধুত্বটা আমাকে ভালো রাখছিল, না শুধু পুরনো স্মৃতির জোরে টিকে ছিল?
- আমি কি সম্পর্কটা ফেরাতে চাই, না শুধু চাই কষ্টটা থামুক?
শর্মিষ্ঠার খাতায় যা উঠে এল
লিখতে বসে শর্মিষ্ঠা দেখল, দূরত্বটা শুরু হয়েছিল দু'বছর আগে, যখন বিয়ের পরে তানিয়া গুরুগ্রামে চলে যায়। ফোন কমে আসছিল, দুজনেই ব্যস্ত। তারপর গত শীতে তানিয়ার বাবা মারা গেলেন, আর ঠিক সেই সপ্তাহে শর্মিষ্ঠার মেয়ের একটা অস্ত্রোপচার ছিল। সে জলপাইগুড়ি যেতে পারেনি, শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল। তানিয়া উত্তরে লিখেছিল, বুঝেছি। তারপর আর কোনো কথা হয়নি। শর্মিষ্ঠা নিজের ভাগটা স্পষ্ট দেখতে পেল: পরে ফোন করে বিস্তারে না বলা, অভিমানে অপেক্ষা করে থাকা। আবার এটাও দেখল, সেই সপ্তাহে যাওয়া সত্যিই অসম্ভব ছিল। নিজের ভুল মানা আর সব দোষ নিজের কাঁধে তোলা এক জিনিস নয়।
একটা চিঠি, পাঠান বা না পাঠান
মনের কথাগুলো একটা চিঠিতে লিখুন, যেন বন্ধু সামনে বসে আছে। কী ভালোবাসতেন, কী কষ্ট দিয়েছে, কোথায় আপনি দুঃখিত। লেখার পরে ঠিক করুন পাঠাবেন কি না। পাঠালে চিঠিটা ছোট রাখুন, কোনো দোষারোপ নয়, কোনো শর্ত নয়, শুধু একটা খোলা দরজা। যেমন: তোর বাবার সময়ে পাশে থাকতে পারিনি, সেটা আজও আমাকে কুরে খায়। তখন কী হয়েছিল একদিন বলতে চাই, যদি তুই শুনতে চাস। তোকে খুব মিস করি। না পাঠালেও লেখাটা কাজে লাগে; মনের ভেতরে ঘুরপাক খাওয়া কথাগুলো কাগজে নামলে তাদের ভার কমে।
কিছু বন্ধুত্ব ফেরে, কিছু ফেরে না। কিন্তু যে বছরগুলো একসঙ্গে কেটেছে, সেগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না।
উত্তর না এলে, নিজের বিদায়
অনেক সময় উত্তর আসে না, বা আসে এমনভাবে যে বোঝা যায় দরজাটা আর খোলা নেই। তখন অন্যের কাছ থেকে সমাপ্তি পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজের মনে একটা বিদায় দিন। সেটা একটা ছোট ব্যক্তিগত আচার হতে পারে: পুরনো ছবিগুলো একটা খামে ভরে তুলে রাখা, দুজনের প্রিয় গানটা একবার মন দিয়ে শোনা, স্কুলবেলার কোনো জায়গায় গিয়ে কিছুক্ষণ বসা। এর মানে ভুলে যাওয়া নয়। এর মানে সম্পর্কটাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়ে একটা জায়গায় রাখা, যাতে প্রতিদিন তাকে বয়ে বেড়াতে না হয়।
তারিখগুলোর জন্য আগে থেকে তৈরি থাকুন
জন্মদিন, পুজোর অষ্টমী, কোনো একটা পুরনো গান, একটা নির্দিষ্ট দোকানের ফুচকা, বন্ধুত্ব ভাঙার পরে এসব হঠাৎ করে বুকে ধাক্কা দেয়। যে দিনগুলো জানা, তার জন্য আগে থেকে একটা পরিকল্পনা রাখুন। শর্মিষ্ঠা ঠিক করেছে, আগামী জন্মদিনে রাত বারোটায় ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকবে না; আগের সন্ধেয় মেয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখবে, তারপর সময়মতো ঘুমোবে। কষ্টটা তাতে উধাও হবে না, কিন্তু সেই রাতটা শুধু অপেক্ষার রাত হয়ে থাকবে না।
নতুন বন্ধুত্ব, তাড়াহুড়ো ছাড়া
কেউ কেউ বলেন, নতুন বন্ধু বানাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। চব্বিশ বছরের বন্ধুর জায়গা ছ'মাসে কেউ নেয় না, আর নেওয়ার চেষ্টাও করা উচিত নয়। বড় বয়সে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বারবার দেখা হওয়া থেকে, একই জায়গায়, একই মানুষের সঙ্গে। তাই এমন কিছুতে যোগ দিন যেটা নিয়মিত: পাড়ার সকালের হাঁটার দল, একটা গানের বা বই পড়ার আসর, কোনো সেবামূলক কাজ। আর যে সম্পর্কগুলো এখনও আছে, অফিসের সেই সহকর্মী যাঁর সঙ্গে দুপুরে গল্প হয়, কলেজের সেই বন্ধু যে মাঝে মাঝে ফোন করে, তাঁদের দিকে একটু বেশি হাত বাড়ান।
যখন কষ্টটা দিনকে ঢেকে দেয়
বাড়ির লোককে বলুন আপনার কী হচ্ছে। জীবনসঙ্গী হয়তো প্রথমে বুঝবেন না কেন একজন বন্ধুর জন্য এত মন খারাপ; তাঁকে বলুন, এটা শোক, আমাকে একটু সময় দাও। আর যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুম না আসে, খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায়, কাজে মন বসে না, বা মনে হয় আর কেউ পাশে নেই, একজন কাউন্সেলর বা ডাক্তারের সাহায্য নিন। এখনই কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন; দিনরাত খোলা, বিনা খরচে, বাংলায়। নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে বা বিপদ মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে 112।
ছক দেখে কি বন্ধুর মন বোঝা যায়?
কেউ কেউ এই সময়ে জানতে চান, বন্ধুর ছক দেখে বোঝা যাবে কি না সে কেন সরে গেল, বা ফিরবে কি না। অন্যের ছক তাঁর সম্মতি ছাড়া দেখা ঠিক নয়, আর কোনো ছক কারও মনের কথা পড়ে দেয় না। নিজের ছক নিয়ে ভাবা যায়, সেটা আলাদা কথা। বৈদিক জ্যোতিষে একাদশ ভাব বন্ধু আর বৃহত্তর সম্পর্কের জগৎ নিয়ে একটা দিক দেখায়, আর কোন দশা চলছে তা দেখে কেউ কেউ নিজের সম্পর্কের ধাঁচ নিয়ে একটু ভাবেন। বিনামূল্যের কুণ্ডলী টুলে নিজের ছকটা বানিয়ে রাখতে পারেন, আর সম্পর্ক ও পরিবারের জ্যোতিষের পাতায় দেখতে পারেন Astro Ratan কীভাবে প্রত্যেকের নিজের ছক ধরে, সম্মতি নিয়ে কথা বলে। বন্ধুত্ব ফিরবে কি না, সেই উত্তর থাকে দুজন মানুষের হাতে।
বিজয়া দশমীর সন্ধে
শর্মিষ্ঠা চিঠিটা এক মাস খাতায় রেখে দিয়েছিল। বিজয়া দশমীর সন্ধেয়, যখন পাড়ার প্যান্ডেল থেকে ঢাকের শেষ বোল ভেসে আসছে আর সবাই কোলাকুলি করছে, সে ছোট করে লেখা অংশটা তানিয়াকে পাঠিয়ে দিল। তিন দিন কোনো উত্তর এল না। চতুর্থ দিন সকালে এল: পড়লাম। একটু সময় দে। শর্মিষ্ঠা জানে না এরপর কী হবে। কিন্তু সে এখন রবিবার সকালে পাড়ার হাঁটার দলের সঙ্গে বেরোয়, আর তার মধ্যে একজন, অবসরপ্রাপ্ত এক দিদিমণি, প্রতি রবিবার ফেরার পথে তাকে জোর করে চা খাওয়ান। তানিয়ার জায়গা কেউ নেয়নি। শুধু বারান্দার অন্ধকারটা আগের মতো অতটা ঘন লাগে না।
Key takeaways
- বন্ধুত্ব ভাঙার শোকের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই, তাই নিজেকেই আগে বলতে হয়: এটা সত্যিকারের কষ্ট।
- বন্ধুর সঙ্গে হারায় নিজের জীবনের একজন সাক্ষী আর একসঙ্গে ভাবা ভবিষ্যৎও; সেই পুরো তালিকাটা চিনে নিন।
- সম্পর্কটা সৎভাবে ফিরে দেখুন, নিজের ভাগ সমেত, কিন্তু সব দোষ নিজের কাঁধে তুলবেন না।
- চিঠি লিখুন, পাঠান বা না পাঠান; উত্তর না এলেও নিজের মনে একটা ছোট বিদায়ের আচার সম্পর্কটাকে সম্মান দেয়।
- নতুন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে নিয়মিত দেখাশোনায়; শূন্যস্থান পূরণের তাড়ায় নয়।
যে মানুষটা কোনো প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে চুপ করে আছে কারণ ভাবছে 'বন্ধুর জন্য এত কষ্ট পাওয়া কি মানায়', তাকে পাঠান: কষ্টটা সত্যি, আর তার থেকে ধীরে বেরোনোর পথও আছে।
প্রিয় বন্ধুকে হারানোর এই সময়টা নিজের জন্মছক ধরে একটু শান্ত মনে বুঝতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন; সে আপনার কথা মনে রেখে পরের বারও কথা বলবে।
