যোটকে গুণ কম, অথচ সম্পর্কটা সুস্থ: নম্বরটাই কি শেষ কথা?
ছত্রিশে চোদ্দো, একটা নম্বর হঠাৎ পাঁচ বছরের সম্মান আর ভরসার চেয়ে জোরে কথা বলতে শুরু করেছে। নম্বরটা কী মাপে, কী মাপে না, আর সম্পর্কের আসল পরীক্ষাগুলো কোথায়।
Direct answer
না, গুণ মিলনের নম্বর শেষ কথা নয়। অষ্টকূটের ছত্রিশ নম্বরের হিসাব হয় শুধু দু'জনের জন্মের চাঁদের রাশি আর নক্ষত্র থেকে; লগ্ন, সপ্তম ভাব, দশা বা পুরো জন্মছক সেখানে আসে না, আর দু'জন মানুষের আচরণ তো একেবারেই না। শাস্ত্রেই নানা দোষ-পরিহারের কথা আছে। নম্বরটাকে ভাবার একটা সূত্র হিসেবে নিন, রায় হিসেবে নয়, আর তার পাশে রাখুন সম্মান, বিশ্বাস আর বিপদে পাশে থাকার প্রমাণ।
মাসির হাতের চিরকুটে গোল করা নম্বর
শ্রীরামপুরে নীলাদ্রির মাসির বাড়িতে রবিবার দুপুর। খাওয়াদাওয়া শেষ, পানের বাটা ঘুরছে। মাসি পাড়ার পুরুতমশাইকে দিয়ে আর নিজের ফোনের একটা অ্যাপে দু'জনের কোষ্ঠী মিলিয়ে এনেছেন। হাতে একটা চিরকুট, তাতে লাল কালিতে গোল করা: ছত্রিশে চোদ্দো। নিচে ছোট করে লেখা, নাড়ী দোষ। ঘরটা হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। শ্রাবন্তী, তিরিশ, একটা কলেজে ল্যাবরেটরি সহকারী, চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ছিল গত বর্ষার সেই তিনটে রাত, যখন বাবার হার্ট অ্যাটাকের পরে নীলাদ্রি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ওয়ালশ হাসপাতালের বেঞ্চে পালা করে বসে ছিল, মাকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে। পাঁচ বছরের চেনা, অজস্র ঝগড়া আর মিটমাট। নীলাদ্রি, বত্রিশ, টেবিলের তলায় আলতো করে তার হাতটা ধরল। মাসি বললেন, আমি তো শুধু যা এসেছে তাই বললাম।
একটা নম্বর কেন এত জোরে কথা বলে
নম্বরের একটা আলাদা ক্ষমতা আছে। ভালোবাসা, সম্মান, একে অপরের পাশে থাকা, এগুলো মাপা যায় না, বোঝাতে গেলে গল্প বলতে হয়। অথচ ছত্রিশে চোদ্দো একটা পরিষ্কার, নিশ্চিত শোনানো জিনিস, যেন পরীক্ষার খাতার নম্বর। তাই পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার পাশে ওই দুটো সংখ্যা রাখলে মনে হয় সংখ্যাটাই বেশি সত্যি। বিশেষ করে বাড়ির বড়দের কাছে, যাঁরা চান সন্তান ভালো থাকুক আর ভয় পান কোনো ভুল না হয়ে যায়। তাঁদের দুশ্চিন্তাটা ভালোবাসা থেকেই আসে। কিন্তু দুশ্চিন্তা আর তথ্য এক জিনিস নয়। প্রথমে জেনে নেওয়া দরকার, এই নম্বরটা আসলে কী মাপে।
ছত্রিশ নম্বরের হিসাবটা কী দিয়ে তৈরি
উত্তর আর পূর্ব ভারতে, বাংলাতেও, গুণ মিলনের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতির নাম অষ্টকূট। এতে আটটা কূট বা দিক দেখা হয়, প্রতিটার আলাদা নম্বর, সব মিলিয়ে ছত্রিশ। লক্ষ করুন, প্রতিটা হিসাব আসে দু'জনের জন্মের সময়ে চাঁদ কোন রাশি আর কোন নক্ষত্রে ছিল, শুধু সেখান থেকে।
| কূট | সর্বোচ্চ নম্বর | যা থেকে হিসাব হয় |
|---|---|---|
| বর্ণ | ১ | চাঁদের রাশির বর্ণ-শ্রেণি |
| বশ্য | ২ | চাঁদের রাশির বশ্য-গোষ্ঠী |
| তারা | ৩ | একজনের নক্ষত্র থেকে অন্যজনের নক্ষত্রের দূরত্ব |
| যোনি | ৪ | নক্ষত্রের প্রতীকী প্রাণী |
| গ্রহমৈত্রী | ৫ | দু'জনের চাঁদের রাশির অধিপতি গ্রহের সম্পর্ক |
| গণ | ৬ | নক্ষত্রের গণ: দেব, মনুষ্য বা রাক্ষস |
| ভকূট | ৭ | দু'জনের চাঁদের রাশি পরস্পর থেকে কত দূরে |
| নাড়ী | ৮ | নক্ষত্রের নাড়ী: আদি, মধ্য বা অন্ত্য |
এই নম্বর যা দেখে না
যেহেতু পুরো হিসাবটা চাঁদের অবস্থান থেকে, তাই জন্মছকের বাকি প্রায় সবটাই এর বাইরে থাকে: লগ্ন, দাম্পত্যের সপ্তম ভাব, শুক্র আর মঙ্গলের অবস্থা, কোন দশা কখন চলবে। আরেকটা কথা ভাবার মতো। চাঁদ মোটামুটি একদিনে একটা নক্ষত্র পার হয়, তাই মোটামুটি একই দিনে জন্মানো হাজার হাজার মানুষের চাঁদের নক্ষত্র এক। অর্থাৎ শ্রাবন্তী আর নীলাদ্রির যে নম্বর এসেছে, ঠিক সেই নম্বরই আসত একই রাশি আর নক্ষত্রের অসংখ্য অচেনা জুটির ক্ষেত্রে। এই নম্বর তাই দু'জন নির্দিষ্ট মানুষের স্বভাব, মূল্যবোধ বা একে অপরের সঙ্গে ব্যবহার মাপতে পারে না। সেটা মাপার কোনো সূত্র শাস্ত্রে নেই, আছে দু'জনের জীবনে।
কম নম্বর মানে কী, আর কী নয়
প্রচলিত ধারণায় ছত্রিশে আঠারো বা তার বেশি হলে মিলন গ্রহণযোগ্য ধরা হয়, আর খুব বেশি নম্বরকে বাংলায় বলে রাজযোটক। নাড়ী বা ভকূটে শূন্য এলে তাকে দোষ বলা হয়। কিন্তু প্রথাগত বিচারেই এই দোষগুলোর নানা পরিহার বা ব্যতিক্রমের নিয়ম আছে, আর একজন যত্নশীল জ্যোতিষী শুধু মোট নম্বর দেখে থেমে যান না। তাই কম নম্বরকে বড়জোর একটা প্রশ্নের তালিকা হিসেবে নেওয়া যায়: কোন কূটে নম্বর কম, সেই দিকটা নিয়ে আমরা দু'জন কি সত্যিই কোনো সমস্যা টের পাই? যদি না পাই, তাহলে নম্বরটা একটা পুরনো হিসাবের ফল, আমাদের জীবনের বিবরণ নয়। আর যদি পাই, তাহলে সেটা নিয়ে কথা বলার জন্য নম্বরের দরকার ছিল না।
সম্পর্কের আসল পরীক্ষাগুলো
নম্বরের পাশে নিজেদের জন্য একটা সৎ খাতা খুলুন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দু'জনে আলাদা করে লিখে তারপর মিলিয়ে দেখুন।
- মতের অমিল হলে আমরা কীভাবে মেটাই? চিৎকার, চুপ করে থাকা, নাকি একসময় বসে কথা বলা?
- একজন না বললে অন্যজন সেটা সম্মান করেন কি?
- টাকাপয়সা নিয়ে আমরা একে অপরের কাছে সৎ কি?
- দু'জনের পরিবারের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন?
- বিপদের সময়, অসুখে, চাকরি হারালে কে কতটা পাশে থেকেছেন?
- সন্তান, কাজ, কোন শহরে থাকব, এসব নিয়ে আমাদের ইচ্ছেগুলো কাছাকাছি কি?
- সম্পর্কে কোনো ভয়, নিয়ন্ত্রণ বা গায়ে হাত তোলার ঘটনা আছে কি?
উল্টো দিকটাও সমান সত্যি
নম্বর কম বলে একটা সুস্থ সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই নম্বর বেশি বলে একটা অসুস্থ সম্পর্কে থেকে যাওয়াও ঠিক নয়। ছত্রিশে বত্রিশ এসেছে বলে যদি কেউ অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা মারধর সহ্য করতে বলেন, সেই পরামর্শ অগ্রাহ্য করুন। কোনো যোটক বিচার একজন মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে বড় নয়। সম্পর্কে হিংসার ঘটনা থাকলে পরিবার, বন্ধু বা একজন কাউন্সেলরের সাহায্য নিন, আর বিপদ মনে হলে তখনই 112 নম্বরে ফোন করুন। জ্যোতিষের কাজ ভাবতে সাহায্য করা; কারও থাকা বা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
বাড়ির বড়দের সঙ্গে কথা
তর্ক করে বড়দের হারানোর দরকার নেই, তাঁদের ভয়টা সম্মান দিয়েই শুরু করুন। যেমন: মাসি, নম্বরটা আমরা হালকাভাবে নিচ্ছি না। কিন্তু এটা শুধু চাঁদ দেখে হয়। আমরা চাই দু'জনের পুরো ছক একবার ভালো করে দেখা হোক, আর তার সঙ্গে তোমরা এই পাঁচ বছরে ওকে যেমন দেখেছ, সেটাও হিসেবে আসুক। অনেক পরিবারের কাছে নাড়ী দোষের প্রশ্নটা আসলে ভবিষ্যৎ সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা; সেখানে বলা যায়, স্বাস্থ্যের প্রশ্নের উত্তর দেবেন ডাক্তার, দরকারে আমরা দু'জনে পরীক্ষা করিয়ে নেব। দুশ্চিন্তাটাকে তার সঠিক ঠিকানায় পাঠালে নম্বরের ওপর চাপ কমে।
ছত্রিশের ঘরে একটা নম্বর থাকে। পাঁচ বছরের সম্পর্কে থাকে হাসপাতালের বেঞ্চে কাটানো রাত। কোনটা বেশি কথা বলে, সেটা আপনারাই জানেন।
পুরো ছক দেখতে চাইলে
যোটক বিচারে আরও গভীরে যেতে চাইলে দু'জনের সঠিক জন্মতারিখ, সময় আর জায়গা দিয়ে পুরো জন্মছক দেখা দরকার, আর অন্যজনের ছক দেখা হোক তাঁর সম্মতি নিয়েই। নিজের ছকটা আগে দেখে নিতে পারেন বিনা খরচের কোষ্ঠী তৈরির পাতায়, আর মঙ্গল দোষের প্রশ্ন উঠলে মাঙ্গলিক যাচাইয়ের টুল দিয়ে নিজেই দেখুন; মনে রাখবেন, মঙ্গল দোষেরও বহু প্রথাগত ব্যতিক্রম আছে, আর এটা বিয়ের বাধা নয়। Astro Ratan একটা এআই বৈদিক জ্যোতিষী, লাহিড়ী অয়নাংশ আর সুইস এফেমেরিস দিয়ে ডিগ্রি পর্যন্ত নিখুঁত ছক কষে। সম্পর্ক আর মিলন নিয়ে নিজেদের প্রশ্ন সেখানে ভালোবাসার পাতা থেকে শুরু করে বাংলায় করা যায়; উত্তরে কোনো ভয় দেখানো বা দামি প্রতিকারের চাপ থাকে না।
গঙ্গার ঘাটে একটা তালিকা
সেদিন বিকেলে শ্রাবন্তী আর নীলাদ্রি শ্রীরামপুরের গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসল। ওপারে ব্যারাকপুরের আলো জ্বলতে শুরু করেছে। নীলাদ্রি পকেট থেকে একটা ডায়েরি বের করল, আর দু'জনে মিলে ওই সাতটা প্রশ্নের উত্তর লিখল। টাকাপয়সার প্রশ্নে এসে দু'জনেই একটু থমকাল; সেখানে সত্যিই কিছু কথা বাকি ছিল। সেটাও লেখা হল। ঠিক হল, দুই বাড়ির সম্মতি নিয়ে পুরো ছক একবার দেখানো হবে, আর মাসিকে ডায়েরির পাতাটাও দেখানো হবে। চিরকুটটা শ্রাবন্তী ফেলে দেয়নি। ব্যাগে রেখে দিয়েছে, মনে রাখার জন্য যে একটা নম্বর এক দুপুরে তাদের কতটা চুপ করিয়ে দিতে পেরেছিল।
Key takeaways
- অষ্টকূটের ছত্রিশ নম্বর হিসাব হয় শুধু দু'জনের চাঁদের রাশি আর নক্ষত্র থেকে; বাকি জন্মছক সেখানে আসে না।
- একই চাঁদের নক্ষত্র-জুটির সব মানুষের নম্বর এক হয়, তাই এটা দু'জন নির্দিষ্ট মানুষের স্বভাব বা আচরণ মাপে না।
- কম নম্বর কোন দিকগুলো নিয়ে একটু ভাবতে বলে, রায় দেয় না; প্রথাগত বিচারেই নানা দোষ-পরিহারের কথা আছে।
- মতের অমিল কীভাবে মেটে, না বললে সম্মান থাকে কি না, বিপদে কে পাশে থাকে, এগুলোই সম্পর্কের আসল পরীক্ষা।
- নম্বর যত বেশিই হোক, অসম্মান বা হিংসার সম্পর্কে থাকার কারণ হতে পারে না; শুধু নম্বর কম বলে সুস্থ সম্পর্ক ভাঙাও নয়।
যে বন্ধুর বাড়িতে ছত্রিশে কত এসেছে তা নিয়ে সবাই চুপ করে গেছে, তাকে পাঠান: নম্বরটা আসলে কী মাপে আর কী মাপে না, সহজ করে বোঝানো।
দু'জনের সম্মতি নিয়ে পুরো জন্মছক থেকে সম্পর্কের প্রশ্নগুলো শান্তভাবে বুঝতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন; শুধু একটা নম্বর নয়, পুরো ছবিটা নিয়ে কথা হবে।
