নতুন বিয়ের পরে মানিয়ে নিতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না
খাওয়ার সময়, টাকার হিসাব, বাপের বাড়ির ফোন, সকালের এক ঘণ্টা, ছোট ছোট অভ্যেসগুলো হঠাৎ মানিয়ে নেওয়ার ভারী শব্দে ঢাকা পড়ে যায়। কোনটা নমনীয়, কোনটা ছাড়বেন না, আর দু'জনের নিজস্ব রীতি গড়ার কথা, নিজেকে মুছে ফেলাকে পরিণতি না ভেবে।
Direct answer
বিয়ের পরে মানিয়ে নেওয়া দরকার, কিন্তু মানিয়ে নেওয়া মানে অভ্যেস বদলানো, নিজের যে অংশগুলো আপনাকে আপনি করে রাখে সেগুলো চুপচাপ ছেড়ে দেওয়া নয়। তিনটে তালিকা করুন: কী বদলাতে রাজি, কী নিয়ে আলোচনা চাই, আর কী ছাড়বেন না। তারপর সঙ্গীকে সেতু করে ছোট ছোট অনুরোধ রাখুন, আর দু'জনের একটা নিজস্ব রীতি গড়ুন। নিজেকে লুকিয়ে কোনো নতুন পরিবারে আপন হওয়া যায় না।
ছাপা চাদরে ঢাকা হারমোনিয়াম
বরানগরের একটা পুরনো দোতলা বাড়ি, শনিবার সকাল সাতটা। ঐন্দ্রিলা, সাতাশ, ছাদে কাপড় মেলছিলেন। বিয়ের চার মাস হল। বোলপুরে বড় হয়েছেন, সংগীতভবনে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পড়েছেন, আর গত দশ বছর এমন সকাল খুব কমই গেছে যেদিন রেওয়াজ হয়নি। হারমোনিয়ামটা বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন, সেটা এখন শোয়ার ঘরে আলমারির পাশে একটা ছাপা চাদরে ঢাকা। কেউ বারণ করেনি। শুধু সকালে শ্বশুরমশাই রেডিওতে খবর শোনেন, বাড়িটা ছোট, আর প্রথম সপ্তাহেই ঐন্দ্রিলার মনে হয়েছিল গান ধরলে অসুবিধে হবে। তারপর আরও কিছু জিনিস আস্তে আস্তে সরে গেছে। একটায় খাওয়ার অভ্যেস ছিল, এ বাড়িতে দুপুরের খাওয়া তিনটেয়। রাত দশটায় মায়ের সঙ্গে রোজের ফোনটা এখন হয় বারান্দায়, ফিসফিস করে। সেদিন কাপড় মেলতে মেলতে তিনি নিজের অজান্তে একটা গান গুনগুন করছিলেন। থেমে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হল, চার মাসে এই প্রথম গাইলেন।
মানিয়ে নেওয়া আর মুছে ফেলা
নতুন বউকে সবাই একটাই পরামর্শ দেন: মানিয়ে নিতে হবে। কথাটা ভুল নয়। দুটো আলাদা বাড়ির দুটো আলাদা ছন্দ এক হলে কাউকে না কাউকে কিছু বদলাতেই হয়, আর সেটা দু'দিক থেকেই হওয়া উচিত। কিন্তু মানিয়ে নেওয়ার আড়ালে অনেক সময় অন্য একটা জিনিস ঘটে যায়, যার নাম কেউ দেয় না: নিজেকে একটু একটু করে মুছে ফেলা। তফাতটা বোঝার একটা সহজ পরীক্ষা আছে। বদলটা কি আপনি ভেবেচিন্তে বেছে নিয়েছেন, না চুপচাপ ছেড়ে দিয়েছেন? আর সেই বদলের কথা কি আপনি সঙ্গীকে বলতে পারেন, নাকি বলতে গেলেই মনে হয় অভিযোগ করছি? খাওয়ার সময় পিছিয়ে দেওয়া মানিয়ে নেওয়া। কাউকে না বলে দশ বছরের গান থামিয়ে দেওয়াটা অন্য জিনিস।
তিনটে তালিকা
মাথার ভেতরের ঝাপসা অস্বস্তিকে স্পষ্ট করতে একটা খাতায় তিনটে কলাম করুন। নিচের উদাহরণগুলো ঐন্দ্রিলার; আপনার তালিকা আপনার জীবনের মতো হবে।
| বদলাতে রাজি | আলোচনা চাই | ছাড়ব না |
|---|---|---|
| দুপুরের খাওয়ার সময় | মাসের খরচের টাকা কে কীভাবে দেবে | নিজের কাজ বা চাকরি |
| রান্নার মশলা আর ধরন | কোন রবিবার কোন বাড়িতে | মা-বাবার সঙ্গে রোজের যোগাযোগ |
| টিভিতে কখন কী চলবে | বাড়ির কাজ কে কতটা করবেন | গান, লেখা, খেলা বা নিজের যে কোনো অভ্যাস |
| বাড়ির পুজো আর পার্বণের রীতি | বাচ্চা কবে, আদৌ কি না | সম্মান আর নিরাপত্তা |
ছোট অভ্যেস, বড় প্রশ্ন
বিয়ের প্রথম বছরে যে জিনিসগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়, সেগুলো শুনলে ছোট মনে হয়: কখন খাওয়া হবে, মাসের টাকা কার হাতে থাকবে, সন্ধেবেলা কে কোথায় যাবেন, বাপের বাড়িতে কতবার ফোন। কিন্তু প্রতিটার পেছনে একটা বড় প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে। খাওয়ার সময়ের পেছনে প্রশ্ন, আমার শরীরের প্রয়োজন এখানে গোনা হয় কি? টাকার পেছনে প্রশ্ন, সিদ্ধান্তে আমার জায়গা আছে কি? ফোনের পেছনে প্রশ্ন, আমার পুরনো জীবনটা কি এখানে অপরাধ? তাই সব একসঙ্গে তুলবেন না। সপ্তাহে একটা বিষয় বাছুন, সবচেয়ে ছোটটা দিয়ে শুরু করুন, যাতে প্রথম আলোচনাটা সহজ হয় আর দু'জনেই দেখেন যে কথা বললে কিছু ভেঙে পড়ে না।
সঙ্গীর সঙ্গে প্রথম কথা
নতুন বাড়িতে আপনার সবচেয়ে বড় সেতু আপনার সঙ্গী। কিন্তু তিনি অনেক কিছু দেখতে পান না, কারণ এটা তাঁর চেনা বাড়ি, চেনা ছন্দ। তাই বলতে হবে, আর বলতে হবে অভিযোগ নয়, নিজের অনুভূতি দিয়ে। যেমন ঐন্দ্রিলা অভীককে বলতে পারেন: জানো, চার মাসে আমি একবারও রেওয়াজ করিনি। কেউ বারণ করেনি, আমিই ভয়ে থামিয়ে দিয়েছি। গানটা না থাকলে আমি নিজেকে ঠিক চিনতে পারি না। বাবার খবর শোনার পরে সকালে আধঘণ্টা রেওয়াজ করা যায় কি না, তুমি একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে? এখানে একটা অনুভূতি আছে, একটা নির্দিষ্ট অনুরোধ আছে, আর বাবার অভ্যেসের প্রতি সম্মানও আছে। সঙ্গী যদি প্রথমে বুঝতে না পারেন, ধৈর্য ধরুন, কিন্তু কথাটা ফিরিয়ে নেবেন না।
দু'জনের নিজস্ব কিছু রীতি
বিয়ের পরে অনেক দম্পতির জীবন দুটো পরিবারের রীতিনীতির মাঝখানে ভাগ হয়ে যায়; নিজেদের বলে কিছু থাকে না। তাই ইচ্ছে করে একটা-দুটো নিজস্ব রীতি গড়ুন, ছোট হলেও। হয়তো রবিবার ভোরে দু'জনে কুঠিঘাটে গিয়ে গঙ্গার ধারে চা খাওয়া। হয়তো রাতে খাওয়ার পরে দশ মিনিট ছাদে, ফোন ছাড়া। হয়তো মাসে একবার একটা সন্ধে, যেখানে দু'জনে জিজ্ঞেস করবেন, এই সংসারে তুমি কেমন আছ, কোন জিনিসটা কঠিন লাগছে? এই রীতিগুলো শুধু রোম্যান্সের জন্য নয়। এগুলো নতুন সংসারে আপনাদের দু'জনের একটা জায়গা বানায়, যেখান থেকে দুই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটা সামলানো সহজ হয়।
নিজেকে লুকিয়ে আপন হওয়া যায় না
অনেক নতুন বউ ভাবেন, আগে সবার মন জয় করি, তারপর নিজের কথা বলব। কিন্তু যে মানুষটাকে শ্বশুরবাড়ি কখনো দেখেইনি, তাকে তারা আপন করবে কীভাবে? আপনার গান, আপনার হাসি, আপনার বই পড়ার অভ্যেস, আপনার রাগ, সবটা মিলিয়েই আপনি। একটু একটু করে নিজেকে দেখান। শাশুড়িকে একদিন জিজ্ঞেস করুন, আপনার পছন্দের কোনো গান আছে? শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে তাঁর খবরের কাগজ নিয়ে দু'কথা বলুন, তারপর নিজের কাজের কথা বলুন। নতুন পরিবার আপনাকে জায়গা দেবে, যদি আপনি নিজে সেই জায়গায় দাঁড়ান। তুলনাও আসবে, দেখো তো ওর জা কেমন মানিয়ে নিয়েছে; অন্যের সঙ্গে তুলনা আর নিজের মূল্য নিয়ে লেখাটা সেই চাপ বুঝতে সাহায্য করবে।
মন যখন ভারী হয়ে থাকে
বিয়ের প্রথম কয়েক মাসে বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করা, একা লাগা, মাঝে মাঝে কান্না পাওয়া খুব স্বাভাবিক, আর এর মানে এই নয় যে বিয়েটা ভুল হয়েছে। কিন্তু সেই মন খারাপ যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকে, ঘুম আর খিদে কমে যায়, কিছুতেই আনন্দ না পান, তাহলে একজন ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন, অথবা Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করে বাংলায় কথা বলুন, বিনা খরচে, দিনরাত। আর একটা কথা পরিষ্কার: অপমান, গালিগালাজ, পণ নিয়ে খোঁটা বা গায়ে হাত তোলার সঙ্গে কোনো মানিয়ে নেওয়া হয় না। সেখানে বাপের বাড়ি, বন্ধু বা আইনি সাহায্য নিন, আর শারীরিক বিপদ মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে 112।
নতুন সংসারে জায়গা করে নিতে নিজেকে ছোট করতে হয় না। নিজেকে নিয়ে আসতে হয়, একটু একটু করে, ভালোবাসা দিয়ে।
যোটক মিলেছিল, তবু মানিয়ে নিতে হচ্ছে
অনেক পরিবার বিয়ের আগে কোষ্ঠী মিলিয়ে নিশ্চিন্ত হন, আর পরে কোনো অস্বস্তি হলে ভাবেন, এত ভালো যোটক ছিল, তবু এমন কেন। কোনো যোটক বিচার দু'জন মানুষের রোজকার অভ্যেসের ঘষাঘষি এড়াতে পারে না, আর কোনো জন্মছকই বলে না যে দু'জনের মধ্যে কাকে নিজেকে ছাড়তে হবে। জ্যোতিষ বড়জোর নিজের এই পরিবর্তনের সময়টাকে একটু বুঝতে সাহায্য করতে পারে। Astro Ratan একটা এআই বৈদিক জ্যোতিষী, সেখানে পরিবারের প্রত্যেকের আলাদা প্রোফাইল রাখা যায়, প্রত্যেকের নিজের ছক থেকে আর তাঁর সম্মতিতে। নিজের জন্মছকটা আগে দেখে নিতে চাইলে বিনা খরচের কোষ্ঠী তৈরির পাতা আছে।
রবিবার সকালের আধঘণ্টা
সেই রাতে ঐন্দ্রিলা অভীককে কথাটা বললেন। অভীক প্রথমে অবাক হলেন, তুমি গাও না কেন, আমি তো ভাবতাম ইচ্ছে করে না। পরদিন সকালে তিনি নিজেই বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন। রবিবার সকাল সাড়ে সাতটায় রেডিওর খবর শেষ হতেই শ্বশুরমশাই একটু আড়ষ্টভাবে রেডিওটা বন্ধ করে দিলেন, বললেন, বাজাও দেখি কী শিখেছ। ঐন্দ্রিলা চাদরটা সরালেন। হারমোনিয়ামের রিডে চার মাসের ধুলো। প্রথম গানটায় গলা একটু কাঁপল। দ্বিতীয় গানের মাঝখানে শাশুড়ি রান্নাঘর থেকে এসে দরজায় দাঁড়ালেন, হাতে খুন্তি। কেউ কিছু বললেন না। কিন্তু পরের রবিবার সাড়ে সাতটায় রেডিওটা আর চালানোই হল না।
Key takeaways
- মানিয়ে নেওয়া মানে অভ্যেস বদলানো; নিজেকে মুছে ফেলা মানে চুপচাপ সেই অংশগুলো ছাড়া, যা আপনাকে আপনি রাখে।
- বদলাতে রাজি, আলোচনা চাই আর ছাড়ব না, এই তিনটে তালিকা মাথার ঝাপসা অস্বস্তিকে স্পষ্ট করে।
- খাওয়ার সময়, টাকা, সময় আর বাপের বাড়ির ফোন, প্রতিটা ছোট অভ্যেসের পেছনে একটা বড় প্রশ্ন থাকে; একবারে একটা নিন।
- দু'জনের নিজস্ব একটা ছোট রীতি নতুন সংসারে আপনাদের জায়গা তৈরি করে।
- মন খারাপ দীর্ঘ হলে সাহায্য নিন; আর অপমান বা হিংসার সঙ্গে কোনো মানিয়ে নেওয়া নেই।
যে নতুন বউ বা বর মানিয়ে নিতে নিতে নিজের প্রিয় অভ্যেসগুলো চুপচাপ তুলে রেখেছেন, তাঁর জন্য: কোনটা বদলাবেন আর কোনটা আঁকড়ে রাখবেন, সহজ করে।
নতুন সংসারে নিজের এই বদলের সময়টা আপনার কোষ্ঠীতে কেমন দেখায়, আর পরিবারের প্রোফাইল কীভাবে সম্মতি নিয়ে রাখা যায়, Astro Ratan-কে বাংলায় জিজ্ঞেস করুন।
