ঘুম ভাঙতেই ফোনে খারাপ খবরের স্রোত—দিন শুরুর আগেই মন ভারী?
চোখ খোলার পরের প্রথম কুড়ি মিনিট কীভাবে একটু নরম করা যায়, ফোনের সামনে কয়েকটা ছোট বাধা বসিয়ে আর খবরের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় রেখে।
Direct answer
ইচ্ছেশক্তির ভরসায় না থেকে ফোন আর আপনার মাঝখানে কয়েকটা ছোট বাধা বসান। রাতে চার্জার বিছানা থেকে দূরে রাখুন, অ্যালার্মের জন্য আলাদা ঘড়ি নিন, খবর আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাপ প্রথম পাতা থেকে সরান। ঘুম ভাঙার পরের কুড়ি মিনিট জানলা, জল, হাঁটা বা চায়ের জন্য রাখুন। খবর পড়ুন দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে, দু-একটা ভরসার জায়গা থেকে, পনেরো মিনিটে।
ভোর পাঁচটা চল্লিশ, মেসবাড়ির সিলিং
বৈঠকখানা রোডের একটা পুরনো মেসবাড়ির তিনতলায় ঋতম, একুশ, কলেজের শেষ বছর। পাশের তক্তপোশে রুমমেট তখনও নাক ডাকছে, জানলার বাইরে আকাশ সবে ধূসর। ঘরের প্রথম আলোটা অবশ্য আকাশের নয়, ঋতমের ফোনের। চোখ আধখোলা অবস্থাতেই আঙুল চলতে শুরু করেছে। উত্তরবঙ্গের বন্যার ভিডিও, জলে ভাসছে একটা গরু। যে সংস্থায় সে ইন্টার্নশিপের আবেদন করেছিল, সেখানে ছাঁটাই নিয়ে লম্বা পোস্ট। কোথাও একটা যুদ্ধের ক্লিপ। ক্লাসের এক বন্ধুর বিদেশি বৃত্তির খবর, নিচে দুশো অভিনন্দন। আর একটা অ্যাপের নোটিফিকেশন: আজ সাবধানে থাকুন। সাতচল্লিশ মিনিট পরে ঋতম যখন বিছানা ছাড়ল, তখনও দাঁত মাজা হয়নি, অথচ বুকের ভেতরটা এমন শক্ত হয়ে আছে যেন রাতভর দৌড়েছে।
ঘুম ভাঙার মুহূর্তটা কেন এত নরম
ঘুম থেকে ওঠার পরের কিছুক্ষণ মন পুরোপুরি জেগে ওঠে না, আবার ঘুমিয়েও থাকে না। এই সময়টায় বিচার করার ক্ষমতা একটু ঢিলে থাকে, আর যা দেখি তা সরাসরি গায়ে লাগে। আমাদের মন বিপদের খবরকে আগে ধরে, কারণ হাজার হাজার বছর ধরে সেটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর ফোনের ফিডের কোনো শেষ নেই; একটা খবর শেষ হলেই নিচে আরেকটা তৈরি। ফলে শরীর এখনও বিছানায়, অথচ স্নায়ু পৌঁছে গেছে পাঁচটা দুর্যোগে। এটা আপনার দুর্বলতা নয়। মন আর যন্ত্র দুটোই যেমন বানানো, তাতে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তাই সমাধানও মনের জোরে নয়, ব্যবস্থার বদলে।
খবর রাখা আর খবরে ডুবে থাকা এক নয়
অনেকে ভাবেন, সকালে সব দেখে না নিলে দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হবে, পিছিয়ে পড়ব। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, সকাল ছ'টায় বন্যার ভিডিওটা চতুর্থবার দেখে ঋতম কী করতে পারত? খবর রাখা মানে জানা, কোথায় কী ঘটছে আর তার মধ্যে কোনটা নিয়ে আমার কিছু করার আছে। দরকার হলে সাহায্য পাঠানো, পরীক্ষার তারিখ বদলালে জেনে নেওয়া, বাড়ির লোকের খোঁজ নেওয়া। একই সংকটের ছবি বারবার দেখা খবর রাখা নয়; তাতে শুধু সংকটের ভারটা নিজের বুকে বয়ে বেড়ানো হয়, কারও কোনো উপকার হয় না।
ফোনের সামনে কয়েকটা ছোট বাধা
যে অভ্যাস পাঁচ সেকেন্ডে শুরু হয়, তাকে থামানোর সহজ উপায় হল শুরুটা একটু কঠিন করে দেওয়া। সব একসঙ্গে না করে দুটো-তিনটে বেছে নিন।
- রাতে ফোন চার্জ দিন ঘরের অন্য প্রান্তে, যেখানে বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে পাওয়া যায় না।
- অ্যালার্মের জন্য একটা সস্তা টেবিল ঘড়ি কিনুন, যাতে ঘুম ভাঙানোর কাজটা ফোনকে না করতে হয়।
- খবর আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাপগুলো প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে একটা ফোল্ডারের ভেতরে রাখুন।
- বাড়ির লোকের ফোন ছাড়া রাতের সব নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন; সকাল ন'টা পর্যন্ত যেন কিছুই না বাজে।
- সপ্তাহখানেকের জন্য সবচেয়ে টানা অ্যাপটা থেকে লগ আউট করে রাখুন; আবার ঢুকতে পাসওয়ার্ড লাগলে সেই কয়েক সেকেন্ডেই অনেক সময় ইচ্ছেটা চলে যায়।
প্রথম কুড়ি মিনিট, আলতো করে
ফোন সরিয়ে দিলেই সকাল ভরে যায় না; ফাঁকা জায়গাটায় কিছু একটা রাখতে হয়, নইলে হাত আবার ফোনের দিকেই যায়। সেটা বড় কিছু হওয়ার দরকার নেই। জানলাটা খুলে বাইরের আলো দেখুন। এক গ্লাস জল খান। দাঁত মেজে ছাদে বা বারান্দায় পাঁচ মিনিট দাঁড়ান, রাস্তার কলের জল পড়ার শব্দ, দোকানের ঝাঁপ খোলার আওয়াজ শুনুন। চা বানান, আর চা খেতে খেতে একটা খাতায় তিন লাইন লিখুন: কাল রাতে ঘুম কেমন হল, আজ কী নিয়ে একটু চিন্তা, আজকের একটা ছোট কাজ। এই কুড়ি মিনিট কাজ গুছিয়ে ফেলার জন্য নয়। শরীরটা যাতে দিনের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিলতে পারে, এ সময়টা তার জন্য।
খবরের জন্য একটা জানলা
খবর বাদ দেওয়ার কথা হচ্ছে না, তাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসানোর কথা হচ্ছে। দিনের এমন একটা সময় বাছুন যখন মন তুলনায় স্থির, যেমন দুপুরের খাওয়ার পরে বা বিকেলে ক্লাস শেষে। পনেরো মিনিট সময় দিন। দু-একটা ভরসাযোগ্য খবরের জায়গা ঠিক করুন, আর সেখানে শিরোনাম পড়ুন, স্ক্রল নয়। শেষে নিজেকে একটাই প্রশ্ন করুন: আজ এর মধ্যে কোনটা নিয়ে আমার সত্যিই কিছু করার আছে? থাকলে সেটা লিখে ফেলুন। না থাকলে অ্যাপ বন্ধ করুন। আপনি জেনে রাখলেন, সেটুকুই যথেষ্ট; বাকিটা বয়ে বেড়ানোর দায় আপনার নয়।
খবর জানা আমার দায়িত্ব, কিন্তু সারা পৃথিবীর উদ্বেগ ভোর ছ'টায় একা বুকে তুলে নেওয়া আমার দায়িত্ব নয়।
যেদিন আবার পিছলে যাবেন
কোনো কোনো সকালে ঠিক ফোনটা হাতে উঠে আসবে, আর আধঘণ্টা পরে খেয়াল হবে। সেদিন নিজেকে বকবেন না; এতে পুরো দিনটাই আরও ভারী হয়ে যায়। শুধু খেয়াল করুন কখন থেকে শুরু হল, ফোনটা উল্টে রাখুন, উঠে এক গ্লাস জল খান। তারপর দেখুন কোন বাধাটা সেদিন কাজ করেনি: চার্জারটা হয়তো আবার বালিশের পাশে চলে এসেছিল, বা কোনো নোটিফিকেশন চালু থেকে গিয়েছিল। অভ্যাস বদলায় একটানা নিখুঁত থেকে নয়, পিছলে গিয়ে বারবার ফিরে আসা থেকে।
যখন এটা শুধু অভ্যাসের চেয়ে বেশি
ফোন সরিয়ে রাখার পরেও যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ সকালে ঘুম ভাঙতেই বুক ধড়ফড় করে, একটা নামহীন ভয় চেপে ধরে, খেতে ইচ্ছে করে না বা রাতে ঘুম আসে না, তাহলে সেটাকে নিছক ফোনের দোষ বলে ছেড়ে দেবেন না। একজন ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন; উদ্বেগের ভালো চিকিৎসা আছে, আর সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। এখনই কারও সঙ্গে কথা বলার দরকার মনে হলে সরকারের Tele-MANAS পরিষেবার 14416 নম্বরে ফোন করুন; দিনরাত খোলা, খরচ লাগে না, বাংলাতেও কথা বলা যায়। নিজের বা অন্য কারও প্রাণের ঝুঁকি মনে হলে দেরি না করে 112-এ ফোন করুন।
ভোরের রাশিফল আর ভয়ের নোটিফিকেশন
ঋতমের সকালের স্রোতে একটা 'আজ সাবধানে থাকুন' বার্তাও ছিল। এমন বার্তা ভোরবেলা পড়লে সারাদিন মন একটা বিপদের অপেক্ষায় থাকে। গ্রহের গোচর রোজকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়; চাঁদও একটা রাশিতে প্রায় সোয়া দু'দিন থাকে, আর ধীর গ্রহগুলো থাকে মাস বা বছর ধরে। যে বার্তা প্রসঙ্গ ছাড়া শুধু ভয় পাঠায়, সেটা বন্ধ করাই ভালো; ভয় দেখানো জ্যোতিষ বার্তা নিয়ে আমাদের লেখাটা এ নিয়ে বিস্তারে বলেছে। কেউ কেউ দিনের শুরুতে নিজের জন্মছক ধরে একটা শান্ত, ব্যক্তিগত বার্তা পড়তে পছন্দ করেন; Astro Ratan-এর দৈনিক ব্যক্তিগত নির্দেশিকা সেরকম একটা বার্তা, ফিড নয়। তবে সেটাও পড়ুন প্রথম কুড়ি মিনিটের পরে, আর যদি কোনোদিন সেটাও ভার মনে হয়, বন্ধ রাখার স্বাধীনতা পুরোপুরি আপনার।
ঋতমের দ্বিতীয় সপ্তাহ
ঋতম শিয়ালদার ফুটপাথ থেকে একটা টেবিল ঘড়ি কিনেছে, ফোনের চার্জার এখন বারান্দার প্লাগে। প্রথম তিন দিন ঘুম ভেঙে কী করবে ভেবে না পেয়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল; নিচে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোর ঝাঁপ তখনও বন্ধ। চতুর্থ দিন ফোন নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গিয়ে পঁচিশ মিনিট কেটে গেল। পঞ্চম দিন আবার ছাদ। এখন সে খবর দেখে দুপুরে ক্যান্টিনে খাওয়ার পরে, আর উত্তরবঙ্গের এক পরিচিত সংস্থাকে বন্যাত্রাণে দুশো টাকা পাঠিয়েছে। বুকের শক্ত ভাবটা পুরো যায়নি, কিন্তু সকালগুলো আবার একটু একটু করে তার নিজের হচ্ছে।
Key takeaways
- সকালের স্ক্রলিং কমাতে প্রতিজ্ঞার চেয়ে কাজে দেয় বাধা: চার্জার বিছানা থেকে দূরে, আলাদা অ্যালার্ম ঘড়ি, অ্যাপ প্রথম পাতা থেকে সরানো।
- খবর রাখা মানে যা নিয়ে কিছু করার আছে তা জানা; একই সংকটের ভিডিও বারবার দেখা খবর রাখা নয়।
- ঘুম ভাঙার পরের কুড়ি মিনিট কাজের জন্য নয়, শরীরকে দিনের সঙ্গে আস্তে আস্তে মেলানোর জন্য।
- খবরের জন্য দুপুরের দিকে পনেরো মিনিটের একটা জানলা রাখুন, আর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আজ এ নিয়ে আমার কী করার আছে।
- সপ্তাহের পর সপ্তাহ সকালে বুক ধড়ফড় বা ভয় থাকলে ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন; Tele-MANAS 14416 সবসময় খোলা।
যে বন্ধু চোখ খোলার আগেই ফোনে দুনিয়ার সব দুর্যোগ দেখে ফেলে আর সকাল থেকে মুখ ভার করে থাকে, তাকে পাঠান: কোনো বকুনি নেই, আছে কয়েকটা সহজ কৌশল।
সকালের শুরুটা ভয়ের খবরে নয়, নিজের জন্মছক ধরে একটা শান্ত বার্তায় চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখে দেখুন, কখন পড়বেন সেটা আপনার ঠিক করা।
