সবার মন সামলাতে সামলাতে আপনাকে কে সামলায়?
কার ওষুধ ফুরোচ্ছে, কার জন্মদিন, কে কার ওপর অভিমান করে আছে, সব মনে রাখেন একজন, আর কেউ সেটাকে কাজ বলে না। সেই কাজটাকে চোখের সামনে আনা, ভাগ করা আর অপরাধবোধ ছাড়া বিশ্রাম নেওয়ার কথা।
Direct answer
সংসারের মনে রাখা, আগে থেকে ভাবা, সবার মেজাজ খেয়াল রাখা আর ঝগড়া মেটানো, এগুলোও কাজ, কারণ এতে সময় আর মনোযোগ খরচ হয়। প্রথমে এক সপ্তাহ লিখে রাখুন কোন কাজ কে মনে রাখে আর কে করে। তারপর সঙ্গীকে ছোট ছোট ফরমাশ নয়, দু-তিনটে কাজের পুরো দায়িত্ব দিন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। আর বিশ্রামকে ক্যালেন্ডারে লিখুন; একটা ফোন ভুলে গেলে সংসার ভেঙে পড়ে না।
বিদ্যুতের বিলের উল্টো পিঠে একটা ফর্দ
বহরমপুরের খাগড়ায় রাত পৌনে বারোটা। সুতপা, চুয়াল্লিশ, সামনের ঘরে সেলাই মেশিনটা ঢেকে রেখে বিদ্যুতের বিলের উল্টো পিঠে কালকের ফর্দ লিখছেন। ব্লাউজ সেলাইয়ের তিনটে অর্ডার শুক্রবারের মধ্যে দিতে হবে, সেটা তো আছেই। তার সঙ্গে: শাশুড়ির থাইরয়েডের ওষুধ তিনটে বাকি, ঋদ্ধির স্কুলের প্রজেক্টের চার্ট পেপার, ননদের শ্বশুরমশাইয়ের জন্মদিনে একটা ফোন, দেবাশিসের মেজমামার শ্রাদ্ধের কার্ড এসেছে, কী নিয়ে যাওয়া হবে, গ্যাসের বুকিং, আর ঋদ্ধি দু'দিন ধরে চুপচাপ, বন্ধুর সঙ্গে কিছু হয়েছে বোধহয়, কথা বলতে হবে। পাশের ঘরে দেবাশিস ঘুমোচ্ছেন। রাতে খেতে বসে তিনি হালকা গলায় বলেছিলেন, তুমি তো সারাদিন বাড়িতেই থাকো, এত ক্লান্ত হও কী করে? সুতপা কোনো উত্তর দেননি। ফর্দটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখলেন, তারপর অন্ধকারে অনেকক্ষণ জেগে রইলেন, কারণ মাথার ভেতরে ফর্দটা তখনও লেখা হচ্ছিল।
যে কাজের কোনো নাম নেই
যে কাজগুলো হাতে করতে হয়, রান্না, বাজার, কাপড় কাচা, সেগুলো অন্তত দেখা যায়। কিন্তু তার পেছনে আরেকটা কাজ চলে, যেটা দেখা যায় না। কী ফুরোচ্ছে মনে রাখা, কার কবে কী দরকার আগে থেকে আন্দাজ করা, কার মুখ ভার খেয়াল করা, দুই আত্মীয়ের মন কষাকষি মিটিয়ে দেওয়া, শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের সুতো ধরে রাখা। এর নাম দেওয়া যায় মানসিক আর আবেগের শ্রম। এটা কাজ, কারণ এতে সময় যায়, মনোযোগ যায়, আর এটা না হলে তার ফল সবাই টের পায়। মুশকিল হল, এই কাজ যত ভালোভাবে হয়, তত অদৃশ্য থাকে। ওষুধ কখনো ফুরোয় না বলে কেউ জানেই না যে কেউ একজন প্রতি সপ্তাহে গুনে দেখেন।
প্রশংসা আর সাহায্য এক জিনিস নয়
অনেক বাড়িতে এই কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হল একটা বাক্য: ও না থাকলে এ সংসার অচল। শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু এর মধ্যে একটা ফাঁদ আছে। প্রশংসাটা কাজটাকে একজনের স্বভাব বানিয়ে দেয়, যেন মেয়েরা বা বাড়ির বউ স্বাভাবিকভাবেই এসব মনে রাখেন, আর বাকিরা স্বাভাবিকভাবেই ভুলে যান। আসলে মনে রাখা কোনো জন্মগত গুণ নয়, অভ্যেস আর দায়িত্ব থেকে তৈরি হয়। যিনি ছোটবেলা থেকে দেখেছেন মা সব মনে রাখছেন, তিনি সেটাই শিখেছেন। যিনি দেখেছেন বাবা শুধু বাজারের থলি হাতে নিচ্ছেন, তিনি সেটা শিখেছেন। অভ্যেস শেখা যায়, তাই বদলানোও যায়।
এক সপ্তাহ, একটা খাতা
ভারটা অন্যকে দেখানোর আগে নিজের কাছে স্পষ্ট করুন। এক সপ্তাহ একটা খাতায় চারটে কলাম টানুন, আর যা মাথায় আসে লিখে যান। শেষ কলামটাই আসল; কাজটা শেষ হল কি না, কে খেয়াল রাখে। নিচে সুতপার খাতার কয়েকটা লাইন, উদাহরণ হিসেবে।
| কাজ | কে মনে রাখেন | কে করেন | শেষ হল কি না কে দেখেন |
|---|---|---|---|
| শাশুড়ির ওষুধ কেনা | সুতপা | দেবাশিস, বলে দিলে | সুতপা |
| ঋদ্ধির স্কুলের মিটিং আর প্রজেক্ট | সুতপা | সুতপা | সুতপা |
| আত্মীয়দের জন্মদিন আর নিমন্ত্রণ | সুতপা | সুতপা, মাঝে মাঝে দেবাশিস ফোনে | সুতপা |
| গ্যাস, বিদ্যুৎ, ডিশ টিভির বিল | সুতপা | দেবাশিস টাকা দেন | সুতপা |
| কার মন খারাপ, কথা বলা দরকার | সুতপা | সুতপা | কেউ না |
ফরমাশ নয়, পুরো দায়িত্ব
খাতা হাতে নিয়ে প্রথম যে কথাটা শোনা যায়, তা হল: আমাকে বললেই তো করে দিই। কিন্তু বলতে হওয়াটাই তো ভার। কী লাগবে মনে রাখা, কবে বলতে হবে ঠিক করা, করা হল কি না খোঁজ নেওয়া, এই পুরোটা থেকে যায় একজনের মাথায়। তাই ভাগটা হোক গোটা কাজের।
- দু-তিনটে পুরো কাজ বাছুন, যেমন মায়ের ওষুধ আর ডাক্তারের তারিখ এখন থেকে পুরোটাই দেবাশিসের: কত বাকি গোনা, কেনা, কবে ডাক্তার দেখাতে হবে মনে রাখা।
- দরকারি তথ্য একবার দিয়ে দিন, দোকানের নাম, ডাক্তারের নম্বর, তারপর আর মনে করাবেন না।
- তাঁর করার ধরন আপনার মতো না হলেও মেনে নিন, যদি কাজটা হয়। অন্য ব্র্যান্ডের সাবান এলে সংসার ভাঙে না।
- প্রথমবার কিছু ভুলে গেলে কাজটা ফিরিয়ে নেবেন না; ভুলের ফলটা তাঁকেই সামলাতে দিন।
- দু'সপ্তাহ পরে একটা সন্ধে বসে দেখুন কী চলছে, কী বদলাতে হবে।
কথাটা কীভাবে তুলবেন
অভিযোগ দিয়ে শুরু করলে সামনের মানুষটা নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, শোনার জায়গা থাকে না। নিজের অবস্থা দিয়ে শুরু করুন। যেমন: আমি ক্লান্ত, আর ক্লান্তিটা শুধু শরীরের নয়। আমার মাথায় সারাক্ষণ একটা তালিকা চলে, রাতে ঘুমোতে গেলেও থামে না। এই খাতাটা একবার দেখো। এর থেকে তিনটে কাজ তুমি পুরোটা নিতে পারবে? খাতাটা এখানে খুব কাজে দেয়, কারণ তর্কটা তখন আর তুমি কিছুই করো না বনাম আমি তো করি থাকে না, কাগজের ওপর লেখা কাজ নিয়ে হয়। ছেলেমেয়ে বড় হলে তাদেরও বয়স অনুযায়ী একটা গোটা দায়িত্ব দিন; চোদ্দো বছরের ঋদ্ধি নিজের স্কুলের জিনিস কবে লাগবে, সেটা নিজেই মনে রাখতে শিখতে পারে।
অপরাধবোধ ছাড়া বিশ্রাম
ভার ভাগ করার পরেও একটা বাধা থাকে, নিজের ভেতরে। কাজ ছেড়ে বসলেই মনে হয় কিছু একটা ভুলে যাচ্ছি, কেউ কষ্ট পাবে। বিশ্রামকে তাই ইচ্ছের ওপর না রেখে ক্যালেন্ডারে লিখুন: সপ্তাহে একটা বিকেল, যখন আপনি কারও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবেন না, হয়তো গঙ্গার ধারে হাঁটবেন, হয়তো শুধু শুয়ে থাকবেন। প্রথম কয়েকবার অস্বস্তি হবে। মনে রাখবেন, ননদের শ্বশুরমশাইয়ের জন্মদিনের একটা ফোন ভুলে গেলে সম্পর্ক ভাঙে না; বড়জোর তিনি একটু অবাক হন। আর আপনি যখন সারাদিন অন্য সবার মন বুঝে চলেন, তখন নিজের মনটা বোঝার জন্যও কিছুটা সময় পাওনা থাকে।
সংসার চলছে বলে কেউ দেখে না কে চালাচ্ছেন। একদিন সেটা দেখানোর দায় আপনার নয়, দেখার দায় সবার।
ক্লান্তি যখন আর শুধু ক্লান্তি নয়
দীর্ঘদিন এই ভার একা বইলে শরীর আর মন দুটোই সংকেত দেয়। ঘুম আসে না বা ঘুম থেকে উঠেও ক্লান্ত লাগে, সামান্য কথায় চোখে জল আসে বা রাগ হয়, যে কাজে আগে আনন্দ পেতেন তাতেও আর মন বসে না, কিংবা ভেতরটা কেমন অসাড় লাগে। এগুলো দুর্বলতা নয়, সাহায্য চাওয়ার সময় হয়েছে তার ইঙ্গিত। একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন, আর মন খুব ভারী হলে Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন, বিনা খরচে, দিনরাত যে কোনো সময়, বাংলাতেই কথা বলা যায়; নিজেকে বা অন্য কাউকে আঘাত করার ভয় হলে সঙ্গে সঙ্গে 112।
কোষ্ঠীতে লেখা নেই যে সব ভার আপনার
কেউ কেউ হাল ছেড়ে বলেন, আমার কপালেই লেখা সবার জন্য খাটা। কোনো জন্মছকে লেখা থাকে না যে সংসারের মনে রাখার দায় একজনের একার। জ্যোতিষ নিজের স্বভাব বুঝতে সাহায্য করতে পারে, যেমন আপনি কেন না বলতে পারেন না, বা কোন সময়টায় আপনার ধৈর্য বেশি টানটান থাকে, কিন্তু কাজের ভাগ ঠিক করবে বাড়ির মানুষের কথাবার্তা। Astro Ratan একটা এআই বৈদিক জ্যোতিষী, সেখানে পরিবারের প্রত্যেকের প্রোফাইল রাখা যায়, প্রত্যেকের নিজের ছক থেকে আর তাঁর সম্মতিতে। নিজের জন্মছকটা আগে দেখে নিতে চাইলে বিনা খরচের কোষ্ঠী তৈরির পাতা আছে। আর মেয়েদের ওপর আরেকটা চেনা চাপ, সন্তান কবে হবে সেই প্রশ্ন, তা নিয়েও আমাদের একটা লেখা আছে।
সকালের প্রশ্ন
সে রাতে সুতপা বিলের ফর্দটার একটা ছবি তুলে দেবাশিসকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালেন, পাশের ঘর থেকেই। নিচে লিখলেন, এর মধ্যে তিনটে কাল থেকে পুরোপুরি তোমার। কোন তিনটে, তুমি বাছো। সকালে চায়ের কাপ হাতে দেবাশিস কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, মায়ের ওষুধটা কোন দোকান থেকে আনো? সুতপা দোকানের নাম বললেন, আর কিছু বললেন না। প্রশ্নটা ছোট। কিন্তু বিয়ের ষোলো বছরে এই প্রথম দেবাশিস কোনো কাজ করার আগে সেটা কোথা থেকে শুরু হয়, তা জানতে চাইলেন।
Key takeaways
- মনে রাখা, আগে থেকে ভাবা আর সবার মন বুঝে চলা কাজ; ভালোভাবে হলে চোখে পড়ে না, না হলে সবাই টের পায়।
- এক সপ্তাহের একটা খাতায় কোন কাজ কে মনে রাখে আর কে করে লিখলে ভারটা প্রথমবার দেখা যায়।
- বলে দিয়ো, করে দেব মানে ভার ভাগ হয়নি; পুরো একটা কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব দিতে হয়।
- অন্যের করার ধরন আলাদা হলে আবার কাজটা নিজের হাতে টেনে নেবেন না, নইলে পুরনো ছকেই ফিরবেন।
- ঘুম, খিদে বা আনন্দ হারিয়ে গেলে সেটা শুধু ক্লান্তি নয়; ডাক্তার আর Tele-MANAS 14416 দুটোই আছে।
যে মানুষটা বাড়ির সবার ওষুধ, জন্মদিন আর মনখারাপের খবর রাখেন অথচ নিজের খবর কেউ রাখে না, এই লেখাটা তাঁর জন্য, আর তাঁর পাশের মানুষটার জন্যও।
কেন আপনি সবার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন, আর নিজের ছকে এই ক্লান্তির সময়টা কেমন, শান্তভাবে বুঝতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন।
