ছেলেমেয়েরা দূরে চলে গেলে জীবন ফাঁকা হয়ে যায় না—শুরু হতে পারে আপনার নতুন অধ্যায়
কুড়ি বছরের দেখাশোনার পরে বাড়িটা হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক; সেই কষ্টকে জায়গা দিয়েও নিজের রুটিন, বন্ধুত্ব আর দাম্পত্য নতুন করে গড়া যায়।
Direct answer
সন্তান বাড়ি ছাড়লে মন খারাপ হওয়া দুর্বলতা নয়, এতদিনের দেখাশোনার একটা স্বাভাবিক শোক। সেই কষ্টকে কিছুদিন জায়গা দিন, তারপর আস্তে আস্তে নিজের নামে একটা রুটিন গড়ুন: পুরনো শখ, একটা নিয়মিত বন্ধুর আড্ডা, একটা কাজ বা শেখা। সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের একটা সহজ ছন্দ দুজনে মিলে ঠিক করুন, আর জীবনসঙ্গীর সঙ্গে নতুন করে কথা বলা শুরু করুন।
সোমবার ভোরে গরম তাওয়া
কৃষ্ণনগরের নেদেরপাড়ায় মালবিকা, বাহান্ন, সোমবার ভোর সোয়া পাঁচটায় উঠে গ্যাস জ্বেলেছেন। আটা মাখা হয়ে গেছে, আলুর চচ্চড়ি কাল রাতেই করা। তাওয়াটা গরম হতে হতে তিনি টিফিনবাক্সটা খুঁজছিলেন, সেই সবুজ ঢাকনার বাক্স, যেটা এগারো বছর ধরে তিতিরের স্কুলব্যাগে যেত। বাক্সটা হাতে নিয়েই থমকে গেলেন। তিতির গত বৃহস্পতিবার পুণেতে হস্টেলে চলে গেছে। বড় ছেলে বেঙ্গালুরুতে, তিন বছর হল। বারান্দায় প্রদীপ, আটান্ন, খবরের কাগজ খুলে বসে। মালবিকা তাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর গ্যাসটা নিভিয়ে দিলেন, খুব আস্তে, যেন আওয়াজ হলে বাড়িটা আরও ফাঁকা শোনাবে।
এই শূন্যতাকে ছোট করবেন না
চারপাশ থেকে তখন নানা কথা আসে। মেয়ে ভালো জায়গায় পড়তে গেছে, এ তো আনন্দের খবর। এখন তো তোমার ছুটি, আরাম করো। কথাগুলো ভুল নয়, কিন্তু এগুলো মনের আসল জায়গাটা ছোঁয় না। যে কাজ বছরের পর বছর দিনের প্রতিটা ঘণ্টা ঠিক করে দিত, সেটা হঠাৎ থেমে গেলে একটা শোক হয়, আর সেই শোকের কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নেই, কেউ সান্ত্বনা দিতেও আসে না। আনন্দ আর কষ্ট একসঙ্গে থাকতে পারে। মেয়ের জন্য গর্ব হচ্ছে, আবার রাতে তার ঘরের খালি খাটটা দেখে গলা বুজে আসছে, দুটোই সত্যি। আর কারও কারও মনে একটা চুপচাপ স্বস্তিও আসে; সেটাও অপরাধ নয়।
যে কাজটা কেউ গুনে দেখেনি
একবার খাতা নিয়ে বসে লিখুন, এত বছর ধরে আপনি আসলে কী কী সামলেছেন। টিউশনের সময় মেলানো, পরীক্ষার রাতে জেগে থাকা, জ্বরের রাতে থার্মোমিটার, স্কুলের মিটিং, আত্মীয়দের সামলানো, মাসের খরচের হিসাব। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে পরিকল্পনা, ধৈর্য, দর কষাকষি, সংকটে মাথা ঠান্ডা রাখা। এই কাজগুলো কেউ কোনোদিন গুনে দেখেনি বলে আপনিও হয়তো ভুলে গেছেন যে এগুলো দক্ষতা। অনেকের পরিচয় এতদিন ছিল 'তিতিরের মা'। সেই পরিচয়টা হারিয়ে যায়নি। শুধু এখন তার পাশে আপনার নিজের নামটার জন্যও একটু জায়গা হয়েছে।
শোকটাকে কয়েক সপ্তাহ সময় দিন
প্রথম ক'সপ্তাহ নিজেকে তাড়া দেবেন না। মেয়ের ঘরটা রাতারাতি সেলাইয়ের ঘর বা ঠাকুরঘর বানিয়ে ফেলার দরকার নেই; ইচ্ছে হলে গিয়ে বসুন, তার বইয়ের তাকটা গোছান, কান্না পেলে কাঁদুন। কাউকে একজন বলুন আপনার কেমন লাগছে, এমন কাউকে যিনি সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেবেন না। আবার শোকের মধ্যে পুরো দিন ডুবিয়ে রাখাও ঠিক নয়। দিনে অন্তত একটা কাজ রাখুন যেটা বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়, বাজারে যাওয়া হলেও। শরীর নড়লে মনও একটু নড়ে।
দূর থেকে সম্পর্কের নতুন ছন্দ
সন্তান দূরে গেলে প্রথম দিকে দিনে পাঁচবার ফোন করতে ইচ্ছে করে: খেয়েছিস? পৌঁছেছিস? ঠান্ডা লাগেনি তো? এই প্রশ্নগুলো ভালোবাসা থেকেই আসে, কিন্তু নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে থাকা ছেলেমেয়ের কাছে এগুলো মাঝে মাঝে ভার হয়ে যায়। তার চেয়ে তার সঙ্গে বসে একটা ছন্দ ঠিক করুন, ধরা যাক রোজ রাতে একটা ছোট মেসেজ আর রবিবার একটা লম্বা ভিডিও কল। আর কলে শুধু তার খবর নেবেন না, নিজের দিনের কথাও বলুন: আজ কোথায় গেলেন, কী পড়লেন, কী রাঁধলেন। সে যেন দেখতে পায় মায়ের জীবনটা চলছে। তাহলে সে নিশ্চিন্তে নিজের জীবনে মন দিতে পারবে, আর আপনার একাকীত্বের দায় তার কাঁধে চাপবে না।
নিজের নামে একটা রুটিন
নতুন অধ্যায় কোনো বড় ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় রোজকার ছোট অভ্যাস দিয়ে। নিচের থেকে দুটো বেছে নিন, একমাস চালিয়ে দেখুন।
- ভোরের যে সময়টা এতদিন টিফিনে যেত, সেটা নিজের জন্য রাখুন: জলঙ্গীর পাড় ধরে আধঘণ্টা হাঁটা, বা ছাদে বসে চা।
- বিয়ের আগে যে শখটা ছেড়ে এসেছিলেন, সেটা ফিরিয়ে আনুন; মালবিকার ক্ষেত্রে ঢাকনা-পরা হারমোনিয়ামটা।
- সপ্তাহে একদিন কিছু শিখুন বা শেখান: পাড়ার লাইব্রেরি, কোনো সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবা, বাচ্চাদের পড়ানো।
- মাসে অন্তত একবার এমন কিছু করুন যেটা শুধু আপনার, কারও দেখাশোনার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
পুরনো বন্ধুরা কোথায় গেলেন
সন্তান মানুষ করার বছরগুলোয় বন্ধুত্ব অনেকের জীবনে সবার আগে কাটছাঁট হয়। স্কুলের বান্ধবীরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শুধু জন্মদিনের শুভেচ্ছা হয়ে টিকে আছেন। এখন সেই গ্রুপে একটা সত্যিকারের প্রস্তাব দিন: সামনের শনিবার বিকেলে কারও বাড়িতে চা, বা একসঙ্গে একটা সিনেমা। প্রথমবার হয়তো দুজন আসবেন, তাতেই চলবে। যাঁর ছেলেমেয়েও বাইরে গেছে, তাঁর সঙ্গে কথা বলুন; নিজের অনুভূতির কথা অন্য একজনের মুখে শুনলে একা লাগাটা অনেকটা কমে।
দুজনের ঘর আবার দুজনের
মালবিকা আর প্রদীপের মধ্যে গত কুড়ি বছরের প্রায় সব কথা ছিল ছেলেমেয়েকে ঘিরে: ফি কবে দিতে হবে, কে স্টেশনে আনতে যাবে। এখন রাতে খাওয়ার টেবিলে শুধু চামচের শব্দ। অনেক দম্পতির কাছে এই নীরবতা ভয়ের লাগে, মনে হয় আর কিছু বলার নেই। আসলে বলার কথা আছে, শুধু অভ্যাসটা হারিয়ে গেছে। সপ্তাহে একটা নিয়মিত দুজনের সময় রাখুন, একসঙ্গে হাঁটা, রান্না, বা কাছের কোথাও একদিনের বেড়ানো। আর একে অপরকে জিজ্ঞেস করুন, সামনের দশ বছরে তুমি নিজের জন্য কী চাও? উত্তর আলাদা হলে ভয় পাবেন না। আর কথা বারবার ঝগড়ায় গড়ালে একজন দাম্পত্য পরামর্শদাতার সাহায্য নেওয়া কোনো লজ্জার ব্যাপার নয়।
মা হওয়াটা শেষ হয়নি, শুধু তার ধরন বদলেছে। আর এই প্রথম অনেক বছর পরে, বাড়িতে আপনার নিজের জন্যও একটা চেয়ার খালি হয়েছে।
যখন খালি ভাবটা কিছুতেই সরে না
কয়েক সপ্তাহের মন খারাপ স্বাভাবিক। কিন্তু যদি মাসখানেক পরেও ঘুম না আসে, খেতে ইচ্ছে না করে, কোনো কিছুতেই আগ্রহ না থাকে, বা মনে হয় বেঁচে থাকার আর কোনো মানে নেই, তাহলে সেটা শুধু ফাঁকা বাড়ির কষ্ট নয়। একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন; এই বয়সে শরীরের নানা বদলও মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাও দেখে নেওয়া দরকার। কারও সঙ্গে এখনই কথা বলতে চাইলে Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন, দিনে-রাতে যে কোনো সময়, বিনা খরচে, বাংলায়। বিপদের আশঙ্কা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে 112।
নিজের ছক, নিজের অধ্যায়
কেউ কেউ এই সময়ে জানতে চান, তাঁদের নিজের জন্মছকে জীবনের এই পর্বটা কেমন। অনেকে লক্ষ করেন, সন্তানদের বাড়ি ছাড়ার সময়টা হয়তো নিজের নতুন কোনো মহাদশা বা অন্তর্দশার শুরুর কাছাকাছি পড়েছে। এমন মিল দেখে জীবনের পরের অধ্যায় নিয়ে ভাবার একটা সূত্র পাওয়া যায়, কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বিনামূল্যের কুণ্ডলী টুলে নিজের ছকটা বানিয়ে রাখতে পারেন। পরিবারের জ্যোতিষের পাতায় দেখবেন, Astro Ratan-এ পরিবারের প্রত্যেকের প্রোফাইল হয় তাঁর নিজের ছক ধরে, আর তাঁর সম্মতি নিয়ে। তাই মেয়ের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় তার ছক ঘাঁটার আগে তার অনুমতি নিন। আর নিজের প্রশ্নটা নিজের জন্যই করুন: এই অধ্যায়ে আমি কী গড়তে চাই?
ছ'সপ্তাহ পরের এক বৃহস্পতিবার
মালবিকার হারমোনিয়ামটা এখন ঢাকনা ছাড়া থাকে। পাশের বাড়ির দীপালিদি আর আরও দুজন মিলে বৃহস্পতিবার সন্ধেয় গান হয়, গলা এখনও পুরো ফেরেনি। রবিবার সকালে প্রদীপের সঙ্গে জলঙ্গীর ঘাট পর্যন্ত হাঁটেন; প্রথম দিন দুজনে প্রায় চুপ করে ছিলেন, তৃতীয় রবিবার প্রদীপ অবসরের পরে একটা ছোট বইয়ের দোকান খোলার স্বপ্নের কথা বললেন, যেটা মালবিকা এতদিন জানতেনই না। তিতির রবিবার রাতে ফোন করে, আর মা এখন তাকে নিজের গানের রেকর্ডিং পাঠান। সবুজ ঢাকনার টিফিনবাক্সটা এখনও তাকে আছে। তাতে এখন হারমোনিয়ামের স্বরলিপির খাতা রাখা।
Key takeaways
- সন্তান বাড়ি ছাড়ার পরের কষ্ট একরকম শোক; তাকে 'বাড়াবাড়ি' না বলে কিছুদিন জায়গা দিন, সঙ্গে স্বস্তি এলেও অপরাধবোধের কিছু নেই।
- কুড়ি বছরের দেখাশোনা যে দক্ষতা শিখিয়েছে, সেগুলো কাগজে লিখুন; ওগুলো দিয়েই নতুন কাজ বা শেখা শুরু করা যায়।
- সন্তানের সঙ্গে রোজকার খবরদারি নয়, দুজনে মিলে ঠিক করা একটা যোগাযোগের ছন্দ সম্পর্ককে হালকা রাখে।
- যে দাম্পত্যের সব কথা এতদিন ছেলেমেয়েকে ঘিরে ছিল, সেখানে সপ্তাহে একটা নিয়মিত দুজনের সময় নতুন করে কথা ফেরায়।
- সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুম, খিদে বা আগ্রহ চলে গেলে ডাক্তারের কাছে যান; Tele-MANAS 14416 দিনরাত খোলা।
যে মা বা বাবা ছেলেমেয়ে হস্টেলে যাওয়ার পর থেকে চুপ করে গেছেন আর বলছেন কিছু হয়নি, তাঁকে পাঠান: কষ্টটা যে সত্যি, আর তারপরও নতুন করে শুরু করা যায়, সেই কথা।
ছেলেমেয়ে বাইরে যাওয়ার পরের এই পর্বটা নিজের জন্মছকের কোন দশায় পড়ছে, আর নিজের জন্য কী নিয়ে ভাবতে পারেন, বাংলায় Astro Ratan-কে জিজ্ঞেস করুন।
