আধুনিক কথ্য বাংলা
Privacy & social pressureআধুনিক কথ্য বাংলা

'সুখবর কবে দিচ্ছ?' প্রশ্নটা কষ্ট দিলে তার উত্তর দিতেই হবে, এমন নয়

সন্তান নিয়ে প্রশ্ন যিনি করেন, তিনি দেখতে পান না উত্তরদাতার ভেতরে কী চলছে; নিজের গোপনীয়তা রক্ষার অনুমতি, কয়েকটা সহজ উত্তর, আর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিজের সময়ে নেওয়ার কথা।

2026-11-01 6 min · 1,363 words

Direct answer

না, উত্তর দিতেই হবে এমন নয়। সন্তান নেওয়া, না নেওয়া বা কবে নেওয়া আপনাদের দুজনের ব্যক্তিগত বিষয়, আর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় নেই। দু-একটা ছোট, ভদ্র উত্তর আগে থেকে তৈরি রাখুন, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ঠিক করুন কাকে কতটা বলবেন। চিকিৎসার প্রশ্ন থাকলে যোগ্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান, নিজেদের সময়ে, অন্যের তাড়ায় নয়।

সোমবারের প্যান্ট্রিতে রসগোল্লার বাক্স

ক্যামাক স্ট্রিটের একটা বিমা সংস্থার অফিসে সোমবার সাড়ে এগারোটা। প্যান্ট্রিতে শ্রেয়া একটা বড় রসগোল্লার বাক্স খুলে দাঁড়িয়ে, লাজুক হেসে খবরটা দিচ্ছে, সে মা হতে চলেছে। সবাই হইহই করে উঠল। পিয়ালী, তেত্রিশ, একটা রসগোল্লা তুলে শ্রেয়াকে জড়িয়ে ধরল, মন থেকেই। ঠিক তখন পাশ থেকে অ্যাকাউন্টসের মিত্রদা বললেন, এবার তোমাদের সুখবরটা কবে দিচ্ছ, পিয়ালী? বিয়ের তো পাঁচ বছর হয়ে গেল। কয়েকজন হাসল। পিয়ালীও হাসল, সেই চেনা হাসিটা। সেদিন সকালে অফিসে আসার আগে সে একটা ক্লিনিকে রক্ত দিয়ে এসেছে; গত দেড় বছর ধরে যে অপেক্ষা আর পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে সে আর অর্ণব যাচ্ছে, অফিসে কেউ জানে না। হাসিটা মুখে রেখেই সে বাথরুমে গিয়ে দশ মিনিট দরজা বন্ধ করে বসে রইল।

প্রশ্নটা হালকা, উত্তরটা নয়

মিত্রদা খারাপ মানুষ নন। তাঁর কাছে প্রশ্নটা ছিল আড্ডার একটা স্বাভাবিক কথা, যেমন লোকে জিজ্ঞেস করে পুজোয় কোথায় যাচ্ছ। কিন্তু যিনি প্রশ্ন করেন, তিনি দেখতে পান না উত্তরদাতার ভেতরে কী চলছে। কেউ হয়তো বছরের পর বছর চেষ্টা করছেন। কেউ হয়তো একটা হারানোর কষ্ট চুপচাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ হয়তো ঠিক করেছেন সন্তান নেবেন না, বা এখন নয়। কারও হয়তো শরীরের অন্য কোনো সমস্যা, বা দাম্পত্যে এমন কিছু যা নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। আর কেউ কেউ শুধু চান ব্যাপারটা ব্যক্তিগত থাকুক। এর যে কোনোটাই হোক, প্রশ্নটার ভার সমান থাকে না।

উত্তর না দেওয়ার পুরো অধিকার আপনার

সন্তান নেবেন কি না, কবে নেবেন, কেন এখনও হয়নি, এই সব প্রশ্নের উত্তর শুধু আপনাদের দুজনের। শরীর আপনার, সংসার আপনাদের। কাউকে কিছু ব্যাখ্যা করার দায় নেই, সহকর্মী হোন বা বাড়ির বড়রা। অনেকে ভাবেন, চুপ করে থাকলে বা প্রসঙ্গ ঘোরালে অভদ্রতা হবে। আসলে সীমা টানা অভদ্রতা নয়; একটা শান্ত, ছোট উত্তর দিয়ে কথাটা থামিয়ে দেওয়া যায়, সম্পর্ক না ভেঙেই। প্রথম কয়েকবার অস্বস্তি হবে, তারপর দেখবেন লোকে প্রশ্ন করাও কমিয়ে দিয়েছে।

কয়েকটা উত্তর, আগে থেকে তৈরি রাখুন

হঠাৎ প্রশ্নের সামনে মাথা ফাঁকা হয়ে যায়, তাই উত্তরগুলো আগে থেকে নিজের ভাষায় একবার বলে অভ্যাস করুন। কাকে কী বলবেন, তা নির্ভর করে মানুষটা কে আর আপনি কতটা বলতে চান।

  • অফিসের সহকর্মী বা পাড়ার চেনা কেউ: ওটা আমাদের দুজনের ব্যাপার। আপনার মেয়ের কলেজ কেমন চলছে? প্রশ্নটা থামিয়ে প্রসঙ্গ বদলে দিন।
  • যে আত্মীয় বারবার জিজ্ঞেস করেন: জানি তুমি ভালোবেসেই বলছ। কিন্তু এ নিয়ে আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাই না, আর জিজ্ঞেস না করলে খুশি হব।
  • কাছের বন্ধু, যাঁকে একটু বলতে চান: ব্যাপারটা আমাদের জন্য একটু কঠিন যাচ্ছে। বিস্তারে বলতে পারব না, শুধু জানিয়ে রাখলাম, পাশে থাকিস।
  • যিনি না চাইতেই ডাক্তার, টোটকা বা মানতের পরামর্শ দেন: ধন্যবাদ, আমরা নিজেদের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছি।
  • কোনো কথাই বলতে ইচ্ছে না করলে: একটা হাসি, আর 'আসি, একটা কাজ আছে'। এটাও একটা পূর্ণ উত্তর।

জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এক দলে

এই প্রশ্নের ভার প্রায়ই মেয়েটির ওপর বেশি পড়ে, যেন ব্যাপারটা শুধু তারই। তাই দুজনে বসে কয়েকটা জিনিস ঠিক করে নিন। কাকে কতটা বলবেন, একদম কিছু না বলবেন কি না। নিজের নিজের পরিবারের প্রশ্ন কে সামলাবেন; সাধারণত যার পরিবার, সে সামলালে সবচেয়ে কম অশান্তি হয়। কোনো অনুষ্ঠানে প্রশ্ন উঠলে একজন অন্যজনকে কীভাবে সরিয়ে আনবেন, তার একটা ইশারা ঠিক রাখুন। পিয়ালী আর অর্ণব ঠিক করেছিল, অর্ণবের মাসি জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে অর্ণব, আর সেই উত্তরে 'ও এখনও চায় না' জাতীয় কোনো দোষারোপ থাকবে না।

প্রশ্ন যখন টোটকা, মাদুলি আর দোষের কথা হয়ে ফেরে

অনেক পরিবারে প্রশ্নের পরেই আসে পরামর্শ: অমুক মন্দিরে মানত করো, অমুক মাদুলিটা পরো, কারও ছকে নাকি সন্তানের দোষ আছে, পুজো করলে কেটে যাবে। স্পষ্ট করে বলা দরকার, কোনো জন্মছক সন্তানধারণের ক্ষমতা নির্ণয় করে না, কোনো কারণ বা চিকিৎসার ফলও বলে দিতে পারে না। অন্যের কথায় কোনো ওষুধ, জড়িবুটি বা দামি প্রতিকার নেবেন না; তাতে টাকা যায়, সময় যায়, আর কখনও কখনও শরীরের ক্ষতিও হতে পারে। যে কেউ ভয় দেখিয়ে এমন প্রতিকার বিক্রি করতে চায়, তার চেনা লক্ষণগুলো ভয় দেখানো জ্যোতিষ বার্তা নিয়ে আমাদের লেখায় বলা আছে।

চিকিৎসার সিদ্ধান্ত, নিজেদের সময়ে

সন্তান চান আর কোনো প্রশ্ন বা দুশ্চিন্তা আছে, এমন হলে একজন যোগ্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রজনন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। অনেক সময় দুজনেরই পরীক্ষা করানোর দরকার হয়, তাই পারলে একসঙ্গে যান। কবে যাবেন, কতদূর চিকিৎসা করাবেন, কখন থামবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনাদের আর আপনাদের ডাক্তারের; আত্মীয়দের তাড়া বা পাড়ার উদাহরণ দিয়ে সেই সময় ঠিক হয় না। আর যদি ঠিক করেন এখনই কিছু করবেন না, বা সন্তান নেবেন না, সেটাও ততটাই সম্মানের সিদ্ধান্ত।

আমার শরীর, আমাদের সংসার, আমাদের সময়। কেউ জিজ্ঞেস করলেই সেটা সবার আলোচনার বিষয় হয়ে যায় না।

যে কষ্টটা কেউ দেখতে পায় না

যাঁরা দীর্ঘদিন অপেক্ষায় আছেন, চিকিৎসার ক্লান্তিতে আছেন, বা কোনো হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের কাছে অন্যের সুখবরও কখনও কখনও কষ্ট দেয়, আর সেই কষ্ট থেকে অপরাধবোধ আসে। দুটো অনুভূতিই মানুষের। একজন কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা এই সময় খুব সাহায্য করে; অনেক হাসপাতাল আর ক্লিনিকে এর ব্যবস্থা থাকে। যদি মন খুব ভারী হয়ে যায়, ঘুম বা খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো চিন্তা আসে, Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন; দিনরাত খোলা, বিনা খরচে, বাংলায় কথা বলা যায়। জীবনের ঝুঁকি মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে 112।

যাঁরা প্রশ্নটা করেন, তাঁদের জন্য

লেখাটা যদি এমন কেউ পড়েন যিনি নিজে এই প্রশ্ন প্রায়ই করেন, তাঁর জন্য একটা ছোট অনুরোধ। 'সুখবর কবে' জিজ্ঞেস না করে জিজ্ঞেস করুন, কেমন আছ? কেউ নিজে থেকে কিছু বললে শুনুন, পরামর্শ বা উদাহরণ দেবেন না। আর মনে রাখবেন, অনেকের কাছে সুখবর মানে সন্তান নয়; একটা চাকরি, একটা সুস্থ বছর, একটা নিজের বাড়ি, এসবও সুখবর।

জন্মছক আর পরিবারের সীমা

কোনো কোনো পরিবারে শাশুড়ি বা আত্মীয়রা বউয়ের ছক নিয়ে গিয়ে জ্যোতিষীর কাছে সন্তানের প্রশ্ন করান, তাঁর অজান্তে। কারও ছক তাঁর সম্মতি ছাড়া দেখানো ঠিক নয়, আর এই প্রশ্নে তো একেবারেই নয়। Astro Ratan-এ পরিবারের প্রত্যেকের প্রোফাইল হয় তাঁর নিজের ছক ধরে, তাঁর সম্মতি নিয়ে; সে সন্তান হওয়ার কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করে না, আর রত্ন, পুজো বা প্রতিকার বিক্রি করে না। পরিবারের জ্যোতিষের পাতায় এর বিস্তার আছে। শ্বশুরবাড়ির এমন চাপে সম্মান রেখে সীমা টানার কথা আমরা শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সীমা নিয়ে লেখায় আলাদা করে বলেছি।

পরের সোমবার, ক্যান্টিনের টেবিল

পিয়ালী সেই সপ্তাহে দুটো উত্তর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে অভ্যাস করেছিল, অর্ণব শুনে হেসেছিল, তারপর নিজেও একটা বানিয়েছিল। পরের সোমবার ক্যান্টিনে মিত্রদা আবার কথাটা তুললেন, এবার একটা চেনা গাইনির নাম সমেত। পিয়ালী শান্ত গলায় বলল, ওটা আমাদের দুজনের ব্যাপার মিত্রদা, আমরা নিজেদের ডাক্তারের সঙ্গেই আছি। আপনার মেয়ের পরীক্ষা কেমন হল? মিত্রদা এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, ঠিক আছে, সরি। কথা গড়িয়ে গেল মেয়ের পরীক্ষায়। সেদিন বিকেলে পিয়ালীর রিপোর্ট আসার কথা ছিল। কী এল, তা সে আর অর্ণব জানে। আর আপাতত সেটা শুধু তাদের দুজনেরই থাকবে।

Key takeaways

  • সন্তান নিয়ে প্রশ্ন যত হালকাভাবেই আসুক, তার উত্তর বা ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো দায় আপনার নেই।
  • অফিসের সহকর্মী, জেদি আত্মীয় আর কাছের বন্ধুর জন্য আলাদা আলাদা ছোট উত্তর আগে থেকে তৈরি রাখলে মুহূর্তটা সামলানো সহজ হয়।
  • জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এক দলে থাকুন: কে কাকে কতটা বলবেন, নিজের পরিবারের প্রশ্ন কে সামলাবেন, আগে ঠিক করে নিন।
  • কোনো জন্মছক সন্তানধারণের ক্ষমতা নির্ণয় করে না; অন্যের পরামর্শে ওষুধ, মাদুলি বা দামি প্রতিকার নেবেন না।
  • চিকিৎসার সিদ্ধান্ত যোগ্য চিকিৎসকের সঙ্গে, নিজেদের সময়ে; কষ্ট ভারী হলে Tele-MANAS 14416।

যে বন্ধুকে প্রতিটা নিমন্ত্রণে, প্রতিটা অফিস-আড্ডায় 'সুখবর কবে' শুনতে হয়, তাকে পাঠান: উত্তর দেওয়ার দায় নেই, আর ভদ্রভাবে থামানোর কয়েকটা কথা আছে।

পরিবারের চাপ আর নিজের সীমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের জন্মছক ধরে এই সময়টা নিয়ে একটু ভাবতে চাইলে Astro Ratan-কে বাংলায় লিখুন; আপনার কথা আপনার কাছেই থাকবে।

FAQ

মা-বাবা নিজেই বারবার জিজ্ঞেস করলে কীভাবে থামাব?

একটা শান্ত সময়ে একবার সরাসরি বলুন, প্রশ্নটা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, আর যখন বলার মতো কিছু হবে আপনি নিজেই জানাবেন। তাঁদের দুশ্চিন্তাটা স্বীকার করুন, কারণ অনেক সময় প্রশ্নের পেছনে থাকে ভালোবাসা আর ভয়। একবার পরিষ্কার বলার পরেও চললে মনে করিয়ে দিন, আমরা তো কথা বলেছিলাম।

সামাজিক মাধ্যমে বন্ধুদের বাচ্চার ছবি দেখে কষ্ট হলে কী করব?

কিছুদিনের জন্য সেই ছবিগুলো না দেখার ব্যবস্থা করা পুরোপুরি ঠিক, অনেক মাধ্যমে কাউকে বন্ধুতালিকা থেকে না সরিয়েই তাঁর পোস্ট লুকিয়ে রাখা যায়। এতে কারও প্রতি অশ্রদ্ধা হয় না। নিজের মনকে সুরক্ষা দেওয়াও যত্নের অংশ।

অফিসে কাউকে কিছু না জানিয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটি নেব কীভাবে?

ছুটির আবেদনে 'চিকিৎসার প্রয়োজনে' বা 'ব্যক্তিগত কারণে' লেখাই যথেষ্ট; কোন চিকিৎসা, তা জানানোর দায় নেই। দরকার হলে শুধু ডাক্তারের সাধারণ শংসাপত্র দিন। সংস্থার ছুটির নিয়ম মানবসম্পদ বিভাগ থেকে একবার জেনে নিন, সহকর্মীদের কাছ থেকে নয়।

প্রশ্নকর্তাকে সোজাসুজি 'এটা জিজ্ঞেস করবেন না' বলা কি অভদ্রতা?

না, যদি স্বর শান্ত থাকে। 'এটা নিয়ে কথা বলতে চাই না' একটা সম্পূর্ণ সম্মানজনক বাক্য। বরং বারবার হেসে এড়িয়ে গেলে অনেকে ভাবেন প্রশ্নটা ঠিকই আছে, আর চালিয়ে যান।