পুরুষেরাও সাহায্য চাইতে পারেন: মুখ বুজে থাকা শক্তি নয়
দায়িত্ব নিতে নিতে কখন যেন চুপ করে থাকাটাই দায়িত্বের চেহারা নিয়েছে, অথচ ঘুম, ধৈর্য আর ভরসা রোজ একটু করে কমছে। সাহায্য চাওয়াকে দায়িত্বেরই অংশ হিসেবে দেখা, আর শুরু করার কয়েকটা ছোট, চেনা পথ।
Direct answer
হ্যাঁ, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, দায়িত্ব। চাপ চেপে রাখলে সেটা ঘুম, মেজাজ আর শরীর দিয়ে বেরোয়, আর পরিবার সেই চাপের দাম দেয় অন্যভাবে। শুরু করুন ছোট করে: একজন বিশ্বস্ত মানুষকে একটা বাক্যে বলুন কী চলছে, ঘুম আর শরীরের কথা ডাক্তারকে জানান, টাকার সমস্যা থাকলে আগেভাগে ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলুন। মন খুব ভারী হলে Tele-MANAS 14416-এ বাংলায় কথা বলা যায়, দিনরাত।
ল্যাম্পপোস্টের নিচে কুড়ি মিনিট
খড়্গপুরের মালঞ্চ রোডে রাত ন'টা পঁচিশ। প্রসেনজিৎ, ছেচল্লিশ, বাড়ির সামনের ল্যাম্পপোস্টের নিচে স্কুটার থামিয়েছেন, ইঞ্জিন বন্ধ, হেলমেট হাঁটুর ওপর। দোতলার জানলায় আলো জ্বলছে; মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকের পড়া পড়ছে, রান্নাঘরে শ্যামলী রুটি সেঁকছেন। গোলবাজারে তাঁর ওষুধের দোকান কুড়ি বছরের। গত বছর রাস্তার ওপারে একটা বড় চেইন ফার্মেসি খুলেছে, তারপর থেকে বিক্রি কমছে, আর দোকান সারানোর জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি মাসে মাসে ঠিক সময়ে আসছে। তিন সপ্তাহ ধরে রাতে চার ঘণ্টার বেশি ঘুম হয় না। আজ দুপুরে দোকানের ছেলেটাকে একটা ভুল বিলের জন্য এমন বকেছেন যে নিজেরই খারাপ লেগেছে। রোজ সকালে রেলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতেন, দু'সপ্তাহ যাননি। ওপরে ওঠার আগে এই কুড়ি মিনিটটা তাঁর মুখটা ঠিক করে নেওয়ার সময়। তারপর সিঁড়ি দিয়ে উঠে বলবেন, সব ঠিক আছে, দোকানে আজ ভিড় ছিল।
দায়িত্ব যখন চুপ থাকার অভিনয় হয়ে যায়
অনেক ছেলে ছোটবেলা থেকে শোনেন, ছেলেরা কাঁদে না, বাড়ির বড় ছেলে ভেঙে পড়লে সংসার ভেঙে পড়বে। বাবাকে দেখেছেন সব সমস্যা নিজের মধ্যে রেখে দিতে, আর সেটাকেই দায়িত্ব বলে শিখেছেন। তাই চাপ বাড়লে তাঁরা আরও চুপ হয়ে যান, ভাবেন বাড়ির লোককে চিন্তায় না ফেলাটাই ভালোবাসা। মুশকিল হল, চাপটা চুপ করে থাকে না। সেটা বেরোয় খিটখিটে মেজাজে, ছেলেমেয়ের ওপর অকারণ চিৎকারে, রাতের পর রাত জেগে থাকায়, বেশি সিগারেট বা মদে, কিংবা এমন এক দূরত্বে যেটা স্ত্রী টের পান কিন্তু নাম দিতে পারেন না। পরিবার শেষ পর্যন্ত চাপটার ভাগ পায়ই, শুধু কারণটা না জেনে। মুখ বুজে থাকা তাই সবসময় শক্তি নয়; অনেক সময় সেটা একটা ক্লান্ত অভিনয়।
শরীর যা আগে বলে দেয়
অনেক পুরুষ মনের কথা বলতে না পারলেও শরীরের কথা বলতে পারেন। তাই এই চিহ্নগুলো খেয়াল রাখুন। এগুলো কোনো রোগ নির্ণয় নয়, শুধু সংকেত যে ভার বাড়ছে।
- ঘুম আসতে দেরি হয়, বা মাঝরাতে ভেঙে গিয়ে আর আসে না।
- ছোট কথায় রাগ, ধৈর্য ফুরিয়ে যাওয়া।
- আগের চেয়ে বেশি মদ, সিগারেট বা খৈনি।
- অম্বল, মাথাব্যথা, বুক ভার, কোনো কারণ ছাড়াই ক্লান্তি।
- যে কাজ, খেলা বা আড্ডায় আগে ভালো লাগত, তাতে আর মন বসে না।
- মনে হয় সবাই আমার ওপর নির্ভর করে, অথচ আমি কারও ওপর নির্ভর করতে পারি না।
সাহায্য চাওয়াও দায়িত্বের অংশ
একজন ট্রাকচালক যখন দেখেন ব্রেক ঠিকমতো ধরছে না, তিনি গাড়িটা গ্যারেজে নিয়ে যান। কেউ তাঁকে দুর্বল বলে না; বরং বলে দায়িত্বশীল, কারণ তিনি নিজেকে আর রাস্তার সবাইকে বাঁচালেন। মনের ক্ষেত্রেও কথাটা একই। যে পুরুষ সময় থাকতে বলেন আমার একটু সাহায্য দরকার, তিনি আসলে পরিবারকে একটা বড় ধাক্কা থেকে বাঁচাচ্ছেন: হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া, রাগের মাথায় কোনো ভুল সিদ্ধান্ত, বা এমন একটা ভেঙে পড়া যেটা আর লুকোনো যায় না। সাহায্য চাওয়া মানে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়। মানে দায়িত্বটা টেকসইভাবে বইতে পারার ব্যবস্থা করা।
ছোট ছোট দরজা
সাহায্য চাওয়া মানেই যে কারও মুখোমুখি বসে বুক খুলে সব বলা, তা নয়। অনেক পুরুষের পক্ষে সেটা সবচেয়ে কঠিন। শুরুটা হতে পারে অনেক ছোট, অনেক চেনা কোনো জায়গা থেকে। একটা বাক্যই যথেষ্ট: কিছুদিন ধরে ঘুম হচ্ছে না, দোকানের চিন্তা মাথা থেকে যাচ্ছে না। বলতে পারেন বন্ধুকে, সকালে হাঁটতে হাঁটতে, পাশাপাশি, চোখে চোখ না রেখে। বলতে পারেন ভাইকে, ফোনে, রাতে। পাড়ার ডাক্তারবাবুকে অম্বলের কথা বলতে গিয়ে ঘুম না হওয়ার কথাটাও জুড়ে দিন; অনেক সময় সেখান থেকেই সঠিক পরামর্শের রাস্তা খোলে। টাকার সমস্যা থাকলে কিস্তি ফসকানোর আগেই ব্যাংকে গিয়ে বিকল্প জিজ্ঞেস করুন। মুখে বলতে না পারলে লিখে পাঠান; একটা মেসেজও দরজা খুলতে পারে। আর কারও সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছে না করলে Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে ফোন করুন, বিনা খরচে, দিনরাত, বাংলায়; অচেনা একজন প্রশিক্ষিত মানুষের কাছে প্রথম কথাটা বলা অনেক সময় সহজ হয়।
স্ত্রী, সন্তান বা বন্ধু কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন
যিনি চুপ করে আছেন, তাঁকে জেরা করলে তিনি আরও গুটিয়ে যান। কী হয়েছে বলো, এত চুপ কেন, এই প্রশ্নগুলোর চেয়ে কাজ করে একটা শান্ত বাক্য: তুমি ক'দিন ধরে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছ, আমি আছি, যখন ইচ্ছে বোলো। তারপর নির্দিষ্ট একটা সাহায্যের প্রস্তাব দিন, যেমন দোকানের হিসাবটা একদিন একসঙ্গে দেখি, বা রবিবার সকালে চলো একটু হাঁটতে যাই। বন্ধুরা একবার নয়, দু'বার জিজ্ঞেস করুন, সত্যি কেমন আছিস? প্রথমবার সবাই বলেন ভালো আছি। দ্বিতীয়বারে কেউ কেউ সত্যিটা বলেন। আর যিনি বলছেন, তাঁকে উপদেশ দিয়ে থামিয়ে দেবেন না, আগে শুধু শুনুন।
যে মানুষটা সবাইকে ধরে রাখেন, তাঁকেও কাউকে না কাউকে ধরতে দিতে হয়। সেটা হার নয়, টিকে থাকার বুদ্ধি।
বিপদের সংকেত চিনে রাখুন
কখনো কখনো চাপ এতটা গভীরে যায় যে মনে হয় আমি না থাকলেই সবার ভালো, বা বেঁচে থাকার কোনো মানে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ নিজেকে আঘাত করার কথা বলেন, বা হঠাৎ জিনিসপত্র গুছিয়ে দেন, ঋণের কাগজ বুঝিয়ে দেন, বিদায়ের মতো কথা বলেন। এগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। এমন চিন্তা এলে বা কারও মধ্যে এমন লক্ষণ দেখলে আজই Tele-MANAS-এর 14416 নম্বরে (বা 1-800-891-4416) ফোন করুন, বিনা খরচে, চব্বিশ ঘণ্টা, বাংলায় কথা বলা যায়, আর প্রাণের তাৎক্ষণিক বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে 112। সেই রাতটা যেন তিনি একা না থাকেন, সেটা নিশ্চিত করুন।
কোষ্ঠী খুলে বসার আগে
কিছু পুরুষের পক্ষে আমি ভালো নেই বলার চেয়ে আমার সময়টা কেমন যাচ্ছে জিজ্ঞেস করা সহজ। তাই অনেকে প্রথমে জ্যোতিষীর কাছে যান। সেটা একটা শুরু হতেই পারে, যদি সেখানে থেমে না যান। জন্মছক দেখে কোন দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বুঝলে কেউ কেউ নিজের এই সময়টাকে একটু ধৈর্য নিয়ে দেখতে পারেন, কিন্তু কোনো গ্রহ বা প্রতিকার ঘুমের ওষুধ বা একজন মনোবিদের জায়গা নিতে পারে না, আর ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ কোনো অবস্থাতেই নিজে থেকে বন্ধ করবেন না। Astro Ratan একটা এআই বৈদিক জ্যোতিষী, হোয়াটসঅ্যাপে বাংলায় লিখলে বাংলাতেই উত্তর দেয় আর আগের কথা মনে রাখে; পরিবারের জন্য আলাদা প্রোফাইল রাখা যায়, প্রত্যেকের সম্মতিতে। ছেলেমেয়ে বাড়ি ছেড়ে গেলে অনেক বাবার যে ফাঁকা লাগা, তা নিয়ে আমাদের লেখাটা দেখতে পারেন। আর কোনো অ্যাপ বিপদের ভয় দেখিয়ে দামি প্রতিকার বেচলে সেই ধরনের বার্তা চেনার উপায় জেনে রাখুন।
ল্যাম্পপোস্টের নিচ থেকে একটা মেসেজ
বৃহস্পতিবার রাতে প্রসেনজিৎ আবার ল্যাম্পপোস্টের নিচে স্কুটার থামালেন। এবার কুড়ি মিনিট বসে থাকলেন না। ফোনটা বের করে শ্যামলীকে লিখলেন: ওপরে আসছি। খেয়ে উঠে একটু কথা বলব, দোকানের ব্যাপারে, অনেকদিন ধরে বলা হয়নি। পাঠিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ফিরিয়ে নেওয়া যায় কি না ভাবছেন। জানলায় শ্যামলীর মুখ দেখা গেল। উত্তর এল একটাই শব্দে: এসো। সেই রাতে সব সমস্যার সমাধান হয়নি। কিস্তি আছে, ওপারের দোকানটাও আছে। কিন্তু পরের রবিবার প্রসেনজিৎ আবার রেলের মাঠে গেলেন, আর হাঁটতে হাঁটতে পুরনো বন্ধু তাপসকে বললেন, জানিস, ক'দিন ধরে ঘুম হচ্ছে না।
Key takeaways
- চুপ করে সব সামলানো অনেক সময় দায়িত্ব নয়, দায়িত্বের অভিনয়; চাপটা থেকে যায়, শুধু অন্য পথে বেরোয়।
- ঘুম কমে যাওয়া, অকারণ রাগ, বেশি মদ বা সিগারেট, অম্বল আর মাথাব্যথা অনেক সময় মনের চাপের প্রথম চিহ্ন।
- সাহায্য চাওয়ার শুরু একটা বাক্য দিয়ে হতে পারে, পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বা গাড়িতে বসে, মুখোমুখি না বসেই।
- পরিবারের কাজ জেরা করা নয়; বলা যে তুমি একা বইছ না, আর নির্দিষ্ট কোনো সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া।
- বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে গেলে আজই Tele-MANAS 14416, আর প্রাণের বিপদে 112।
যে বাবা, দাদা বা বন্ধু সব সময় বলেন সব ঠিক আছে, অথচ রাতে ঘুমোন না, তাঁকে এটা আলতো করে পাঠান; সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা না ভাবার একটা লেখা।
আমি ভালো নেই বলতে বাধলে অন্তত এই সময়টা কেমন যাচ্ছে সেটা দিয়ে শুরু করুন; নিজের ছক নিয়ে Astro Ratan-কে হোয়াটসঅ্যাপে বাংলায় লিখুন, আর দরকারে ডাক্তারের কাছেও যান।
